প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৪ পিএম (ভিজিট : )
'বালিশ মিষ্টি'।
রাখাল বিশ্বাস,তাজাখবর২৪.কম,কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি : গারো পাহাড়ের পাদদেশের হাওর বেষ্টিত নেত্রকোনা জেলার জিআই পণ্যের স্বীকুতি প্রাপ্ত গয়ানাথের বিখ্যাত 'বালিশ মিষ্টি'। এই মিষ্টি অসাধারণ স্বাদের জন্য শুধু দেশ বিখ্যাতই নয় নেত্রকোনার এক ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রসিদ্ধ এই মিষ্টির ডিজাইন, সাইজ ও দুধমলাইয়ের মিশ্রনে রসনাতৃপ্তকর হওয়ায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও এর খ্যাতি রয়েছে প্রচুর। এই মিষ্টির উদ্ভাবক প্রয়াত গয়ানাথ ঘোষ। তিনি ১৮৮৫ সালের ২ফেব্রুয়ারী নেত্রকোনায় জন্ম গ্রহন করেন এবং ১৯৮৬ সালের ২৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। জনশ্রুতি আছে এই মিষ্টি তৈরির কৌশল তিনি স্বপ্নে প্রাপ্ত হোন। এমন কথাও প্রচলিত আছে নির্ধারিত কারিগর ছাড়া বালিশ মিষ্টি তৈরির ঘরে অর্থাৎ কারখানায় অন্যের প্রবেশাধিকার নেই। খুব সংগোপনে নির্ধারিত কারিগর দ্বারাই এই মিষ্টি তৈরি করা হয়। এর কারণ হয়তো অন্য কেউ যেনো নকল করতে না পারে।
ব্যাতিক্রমী এই বালিশ মিষ্টির ইতিহাস সমন্ধে যতটুকু জানা যায়, এই মিষ্টি কোলবালিশের মত গোল লম্বাটে। স্বভাবিক মিষ্টির চেয়ে আকৃতিতে বড় এবং রসালো ও সুস্বাদু। একেকটি মিষ্টির ওজন এক কেজি পর্যন্ত হয়।গরুর খাঁটি দুধের মিষ্টির ওপর আলতো করে মলাইয়ের পাতলা আস্তর দেওয়া হয়। সাথে ঘিয়াভখয়েরী কালার ও শিরারসের প্রলেপ বালিশ মিষ্টির স্বাদকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়। এছাড়া এর ঘ্রান মিষ্টিটিকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলে। এই মিষ্টি নেত্রকোনা জেলার শতবছরের ঐতিহ্য হিসেবে বালিশ মিষ্টি নামে ব্যাপক পরিচিত।গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি কেবল নেত্রকোনা জেলার ঐতিহ্যই নয় কালের পরিক্রমায় এর খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ-বিদেশেও।এমনিতেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে ঘোষ পরিবার দধি-দুগ্ধ ও নানা প্রকার মিষ্টি তৈরির জন্য বিখ্যাত,তার মধ্যে নেত্রকোনার গয়ানাথ ঘোষ ছিলেন অসাধারণ দক্ষ মিষ্টির কারিগর।
'বালিশ মিষ্টি'।
সরেজমিনে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জানা যায়,নেত্রকোনা শহরের বারহাট্টা সড়কের পাশেই ঐতিহ্যবাহী "গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভান্ডার" নামের বালিশ মিষ্টির প্রতিষ্ঠানটি। অনেক লোক দোকানে কাজ করছেন, বহু লোক তাদের পছন্দের বালিশ মিষ্টি খাচ্ছেন আবার অনেকেই কয়েক কেজি করে প্যাকেট নিয়ে যাচ্ছেন। কথা বলে জানা যায়, এর স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন গয়ানাথ ঘোষ। ছোট বেলা থেকেই তিনি মিষ্টির ব্যবসা করতেন।শতাধীক বছর পূর্বে তিনিই বালিশ মিষ্টি উদ্ভাবন করেন।গয়ানাথ ঘোষের স্বপ্ন ছিল নতুন নামের কোন মিষ্টি আবিস্কার করে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া। একদিন কল্পনার রথে চড়ে বিশাল আকারের এক মিষ্টি তৈরি করলেন। কৌতুহলী মানুষ সেই মিষ্টি খেয়ে সুখ্যাতি করায় অল্পদিনেই তা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগলো। মিষ্টির আকার প্রকৃতি অনেকটা কোলবালিশের মত দেখতে। স্বাদে-গন্ধে অপূর্ব হলেও এই মিষ্টির তখনও কোন নামকরণ করা হয়নি। সূত্রের দাবি,একদিন এই মিষ্টি খেয়ে আব্দুস সালাম পেয়ার মিয়া নামে স্থানীয় এক রাজনৈতিক ব্যাক্তি বালিশের মত হওয়ায় এই মিষ্টির নাম দেন 'বালিশ মিষ্টি। সেই থেকে ধীরে ধীরে এই নামটিই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। স্বাদে গুণে মানে অতুলনীয় হওয়ায় অল্পদিনেই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে গয়ানাথের বালিশ মিষ্টির নাম।
এবিষয়ে মঙ্গলবার কথা হয় নেত্রকোনার লেখক, সাহিত্যিক কবি অধ্যাপক ননী গোপাল সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন গয়ানাথ বাবুর প্রধান কারিগর ছিলেন বোকাইনগরের নিখিল মোদক।তিনি গয়ানাথবাবুর বাসায় থেকে মিষ্টির কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৭১ সালে গয়ানাথবাবু নিখিল মোদকের কাছে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে ভারতে চলে যান।পরবর্তীতে নিখিলবাবু প্রতিষ্ঠানের নাম 'গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভান্ডা' রেখেই বালিশ মিষ্টির ব্যাবসা ও পরিচিতির প্রসার ঘটান। তিনি আরও বলেন,২ বছর তিনি নিখিলবাবুর বাসায় লজিং থেকে তার ছেলে মেয়েদের পড়িয়েছেন। সেই সুবাধে তিনি প্রচুর বালিশ মিষ্টি খেয়েছেন। শুধু নামে নয় এই মিষ্টি দেখতে যেমন সুন্দর খেতেও ভারী মজা। তিনি জানান, নেত্রকোনার এই বালিশ মিষ্টি ২০২৫ সালে দেশের ৫৮তম জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়। এটি নেত্রকোনার ঐতিহ্যের আর এক প্রতীক।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৫ রবউসি সানি ১৪৪৮