প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০২ পিএম (ভিজিট : )
ভেজা মাঠের ঝর্ণার বিরহে টেমস নদী আজও কাঁদে
কলমেঃ মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু,তাজাখবর২৪.কম: প্রকৃতির কোনও মাজহাব নেই ওরা জল বায়ুর মতো নিজেদের মতোই বহমান, লা মাজহাব! মাজহাব তো মানুষের বানানো জটিল ও কুটিলতম দেয়াল, প্রকৃতি সেই দেয়াল ভাঙার শ্বাসত চির অমর নাম। গড়িয়ে গড়িয়ে বংশীর জল যখন টেমসে যায়, তখন সে তো জিজ্ঞেস করে না- তুমি হিন্দু না মুসলিম না-কি ইহুদি খ্রিস্টান? ঘনকালো মেঘ যখন বৃষ্টি হয়ে নামে, তখন সে তো দেখে না- এটা মসজিদের উঠান না গির্জার ছাদ? নদীর কোনো দেশ নেই, জলের কোনো ধর্ম নেই, ভালোবাসার কোনো সীমানা প্রাচীর নেই। তাই তো শায়েরির মতো করে যে গল্পটার শুরু হওয়ার কথা ছিল ৫০ হাজার বছর আগে সেটা আজ সমাপ্ত হতে চলেছে তন্দ্রার কথামালায়। আজ থেকে ৫০,০০০ বছর আগে টেমস এখনকার মতো ছিল না। সেটা ছিল বরফ যুগ- Last Glacial Period এর সময়:চেহারা ছিল আলাদা: তখন টেমস অনেক বেশি চওড়া, অগভীর এবং বরফ গলা জলে ভরা একটা এলোমেলো ধারার নদী (braided river) ছিল। আজকের মতো এতোটা কাব্যিক, সুন্দর, জমকালো ও মনোমুগ্ধকর চ্যানেল ছিল না। সমুদ্রের জলের স্তর অনেক নিচে থাকায়, টেমস তখন লন্ডন পেরিয়ে অনেক দূর- তখন ব্রিটেন ইউরোপের সাথে স্থলপথে যুক্ত ছিল।
তাহলে চারপাশে কী ছিল: লন্ডনের আশেপাশে কোনো শহর ছিল না, ছিল তুন্দ্রা- বরফ ঠান্ডা খোলা প্রান্তর। নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াত- উলি ম্যামথ, উলি গন্ডার, বাইসন, বন্য ঘোড়া, গুহা সিংহ আর হায়েনা।
মানুষ কে বা কি ছিল: আধুনিক মানুষ তখনও ব্রিটেনে আসেনি। তখন টেমসের পাড়ে বাস করত নিয়ান্ডারথাল মানুষ। তারা পাথরের অস্ত্র দিয়ে বিশাল প্রাণী শিকার করত। ইউরোপিয়ানরা তাদেরই বংশধর। অর্থাৎ আজকের প্রিয় মিঠে টেমস তখন মিঠে ছিল না, ছিল এক ভয়ংকর, বন্য, বরফ-গলা জলের স্রোত। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের মাধ্যমে টেমস নদীকে আজ আমরা সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে ফিরে পেয়েছি।
যাই হোক- ছোট্ট থেকে বড় হওয়ার গল্প। যৌবন ধরে রাখার গল্প। যাপিত জীবনের গল্প। হে রাজাধিরাজ, প্রেম বিরহের গল্প শোনাব আজ!
টেমসের জন্ম ইতিহাস একটা ভেজা মাঠ থেকে, জায়গাটার নাম Thames Head, গ্লস্টারশায়ারের Kemble গ্রামের একটা নির্জন ময়দান, যেন বাবু'র গ্রামীণ জনপদ। নির্জনতার আলোয় আলোকিত গোটা ইউরোপ, যার ছোঁয়া ও ছায়া পড়েছে বান্দরবানের দেবীরুমা কবিপল্লী রিসোর্টে; বলেছেন কবি, এ এক মহাজাগতিক প্রতিচ্ছবি! হে চির সবুজ স্বর্ণা আসলে সেখানে ছিল না কোনো ধুমধাম ঝর্ণা। একটা পাথরে লেখা আছে "The Source of the Thames" তার নিচে আলীর গুহার মতো একটা ছোট্ট গর্ত। জমাকৃত শুক্রাণুকে গর্ভে ধারণ করে এবং একসময় গর্ভপাত হয়, হয় ভূমিষ্ট। বছরের ৯ মাস সেই গর্ত শুকনো থাকে! কেবল যৌবনের তিনটি মাস প্রাণ ফিরে পায়! লোকে তাই বলে- জগতকে সজীব করে তোলে। ঠিক যেন সহস্র ঝর্ণাধারার মতো, ঐ সেই সীতাকুণ্ডের মতো। তাহলে কামনার জল আসে কোথা থেকে? এ এক অদ্ভুত প্রশ্নোত্তর! পুরো Cotswold Hills টা হলো চুনাপাথরের Limestone দিয়ে তৈরি। বৃষ্টির জল সেই চুনাপাথরের ফাঁক দিয়ে ঢুকে ভেতরে জমা হয়- যাকে বলে Aquifer, প্রকৃতির কৌশল।
ঋতুর অমোঘ চক্রের পালাবদলে শীতকালে যখন প্রচুর বৃষ্টি হয়, তখন সেই ভূগর্ভের জল পোয়াতির মতো উপচে ওই গর্ত দিয়ে জোয়ারের মতো বেরিয়ে আসতে শুরু করে শিশিরসিক্ত সরোবর। আমি অন্তরচক্ষু দিয়ে অনুভব করলাম- প্রথমে শুধু ভেজা ঘাস, তারপর কাদা, অতপর একটা সরু নালা, শুরু হয় ভূমিষ্ট হওয়ার জ্বালা কারণ সে মা হতে চায়! কিন্তু আমি দূরে বহুদূরে। জমজমের কূপ ছড়িয়েছে টেমস নদীর ধূপ! আমি জমজমের কূপ দেখে, দেবতাখুম দেখে তোমাকে অনুভব করেছি, এঁকেছি জল্পনায়, স্বপ্নের কল্পনায় আর কিছু আল্পনায়!
ওরা জানে না, সেই নালাই আমার মতো প্রিয়তমার প্রতিক্ষায় অপেক্ষায় হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘ ৩ মাইল পর Seven Springs নামে আরেকটা এসএস ঝর্ণার সাথে মেশে- এটাই আসল শক্তিশালী একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, বলেছে আমায় মৎস্য! অনেকেই বলেন Seven Springs-ই টেমসের প্রকৃত মাদার, Thames Head ফাদার, ঠিক যেন আমার দেবীরুমা প্রিয়তমার মতোই প্রেমের সরোবর।
যারপরনাই তারপর?
আদিকালের যৌবনের সেই প্রথম ১০ কিলোমিটার তুমি বা আমি লাফ দিয়ে পার হতে পারব, এত ছোট্ট। ২০ কিলোমিটারের পর হাঁটুজল। এভাবেই বড় হতে থাকে রাখাল বালকের স্বপ্ন, Oxford এ গিয়ে তখন তার নাম হয়ে যায় Isis, তখন সে নৌকা টানতে পারে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদের সেই সাগরদাঁড়ির দাঁড় বা পালতোলা নৌকা, London এ এসে সে হয়ে যায় ২৫০ মিটার চওড়া, সমুদ্রের মতো যেন বিলেতি বাবু ভুলে যায় অতীত ইতিহাস। একফোঁটা জলের মূল্য ওরা কেন দিতে চায় না? আমিও তো টেমসের জনক জননীর একজন!
মনে রাখবে যেমন তোমার একটা ছোট্ট খেয়াল থেকে একটা বড় নজম হয়, ঠিক তেমনি এক ফোঁটা বৃষ্টির জলবিন্দু হতে ৩৪৬ কিলোমিটার লম্বা Father Thames হয়। "মনে রাখবে বন্ধু তুমি পাহাড়ে চড়ে দেখবে থানচির তিন্দু"!ঐতিহাসিক কবি'রা তাই বলেন- "Great rivers are born in humble meadows." আর আমি বলি- "আমাজানের মতো অশ্রুজলে স্বর্গীয় নদনদী দেখি মরুস্থলে"। আমার একফোঁটা অশ্রু দিয়ে তোমাকে সৃষ্টি করে গেলাম। "কোথায় মালয় কোথায় হিমালয় দেখি নাই কভু আমি, বঙ্গের জলে হিমালয় দেখিয়াছি টেমসের বক্ষস্বামী"।
ঐতিহাসিক বাস্তবতায় টেমস নদী শুধু একটি নদী নয় এটা ইংরেজি সাহিত্যের বড় একটা চরিত্র। ২০০০ বছরের অধিককাল ধরে কবি সাহিত্যিকগণ এর প্রেমে পড়েছেন। ৮ হাজার মাইল দূরে বসে প্রকৃতির সন্তান কৃষক ও মেহনতী মানুষের কবি মুহাম্মদ শামসুল হক বাবুও প্রেমে পড়লেন, যার সাক্ষী আমি নিজেই। আজ ওর স্বপ্ন সত্যি হলো, ধন্য হলো পূর্ণ হলো জীবন! যে কবি বেশি কিছু পায় না, সে কিছু চায় না।
তাই তো টেমস নদী নিয়ে কবিতার ইতিহাসকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন:
মধ্যযুগ (১৪০০ সাল): লোকমুখে প্রচলিত ছিল একটি নাম আর তা হলো পবিত্র নদী। তখন টেমসকে বলা হতো "Father Thames"। জিওফ্রে চসার তার ক্যান্টারবেরি টেলসে টেমসকে লন্ডনের প্রাণ হিসেবে দেখিয়েছেন। আরও অনেক কাহিনী ইতিহাসে প্রচলিত আছে।রেনেসাঁ যুগ (১৫৯০-১৭০০): তখন টেমস হয়ে যায় প্রেম ও রাজকীয় নদী তোমরা দেখতা যদি। জলোরণ্যের প্রেমালাপ।এডমন্ড স্পেনসার (১৫৯৬): Prothalamion কবিতায় লিখেছেন - "Sweet Thames, run softly, till I end my song" - এই লাইনটা আজও জগত বিখ্যাত হয়ে আছে।আলেকজান্ডার পোপ (১৭১০): Windsor-Forest কবিতায় টেমসকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতীক বানিয়েছেন। এ এক বিরল সম্মান।
রোমান্টিক যুগ (১৮০০): দুঃখ ও দর্শনের নদী। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ: Composed upon Westminster Bridge (১৮০২)- বইটি ভোরবেলায় ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ থেকে টেমসকে দেখে লিখেছেন। অপরদিকে সুখিয়া পাহাড় চূড়ায় বসে মাতামুহুরি নদী দর্শন করে টেমস নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন আমাদের কবি শামসুল হক বাবু।টি. এস. এলিয়ট (১৯২২): The Waste Land- এখানে টেমস আর পবিত্র নেই, নোংরা এবং মৃত নদী যেন ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গার কথাই মনে পড়ে যায় "The river sweats, Oil and tar" আধুনিক লন্ডনের ক্লান্তি, কে দূর করিবে ভুলভ্রান্তি।আধুনিক যুগ: রুডইয়ার্ড কিপলিং থেকে শুরু করে আজকের কবি সবাই টেমসকে নিয়ে লিখেছেন। কারণ টেমসের দুই পাড়েই ইংল্যান্ডের ইতিহাস- রাজার প্রাসাদ, শেক্সপিয়ারের থিয়েটার, আর আমার মতো কৃষকের গরিবের বস্তি, এ কথাটি শুনলে মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্প পায় ক্ষণিক স্বস্তি।
একটি মজার বিষয়: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৭৮ সালে লন্ডনে গিয়ে টেমস নদী দেখে লিখেছিলেন - টেমসের কুয়াশা তাকে বাংলার নদীর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। আর মাইকেল মধুসূদন দত্তকে মনে করিয়ে দেয় তার হারানো জন্মভূমি সাগরদাঁড়ির কথা, কপোতাক্ষ নদের কথা, সে কথা আরেকদিন বলব।বর্তমান যুগ: আর কোনও কথা হবে না। এ যুগে শুধুই একটি নাম উচ্চারিত হবে আর তা হচ্ছে বাবুঞ্জলীর প্রেমালাপ। সেই অজপাড়াগাঁয় জীর্ণশীর্ণ কুঠুরিতে যে শায়েরির বসবাস সেও ত্রিমাত্রিক নয়ন দিয়ে উপলব্ধি করলেন টেমস নদীর মায়াবী সৌন্দর্য। তিনি টেমসের বৃত্তে আকুল চিত্তে মিনতি ও বিনতি করেছেন-
"দিল কি বাত খতম না হোনে তক,
অ্যায় মিঠে টেমস! জারাছা ধীরছে বহো,
মেরা গীত খতম না হোনে তক,
স্রেফ দেবীরুমা কা বাদ কহো"।
তিনি আরও বলেছেন-
হে স্বপ্নচারী, স্রোতস্বিনী
আদেখার নদী,
মোর দুটি দুখের কথা, তুমি
শুনতে যদি।
একটি কথা পৌঁছে দিও
দেবীরুমার কানে,
আরেকটি কথা লিখে রেখো
যাতে, ইতিহাস জানে।
বাবু'র মতো ৪০০ বছর আগে স্পেনসারও নদীর সাথে এভাবেই হৃদয়ের কথা মনের কথা বলেছেন।জগত বিখ্যাত টেমস নদীর ভূগোলটা শুনলে বাবুঞ্জলীর শায়েরির মতোই লাগবে- একটা ছোট্ট ঝর্ণা হতে জন্ম নিয়ে কিভাবে বিশাল সমুদ্র হয়ে যায়। স্বপ্নের যেমন কোনও সীমা প্রাচীর থাকে না তেমনি তুমি!
তবে আসুন জেনে নেই টেমস নদীর ভৌগোলিক অবস্থান এবং গঠন:
জন্ম এবং মৃত্যু:
উৎস: সেই ব্রিটিশ সেই ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারের Cotswold Hills এর Thames Head নামক একটা ছোট্ট মাঠ থেকে, যার উচ্চতা মাত্র ১১০ মিটার।
মোহনা: ৩৪৬ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে Southend on Sea তে North Sea বা উত্তর সাগরে মিলিত হয়েছে, তাই তো বাবু'র মতো কবি আজও স্বপ্ন দেখে।
একদিন দেখা হবে কথা হবে
মিলিবে দেহ অঙ্গ,
টেমসও প্রেমে পড়িয়া খুঁজিবে বাবুকে
কোথায় প্রিয় বঙ্গ!
নদীটির দৈর্ঘ্য: ৩৪৬ কিলোমিটার (২১৫ মাইল)- ইংল্যান্ডের সবচেয়ে লম্বা নদী, UK তে এটি দ্বিতীয়।
পথ: Kemble হতে Oxford হতে Reading হতে Windsor হতে London হতে Thames Estuary. ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়।এক সময়ের পৃথিবীর রাজধানী লন্ডন শহরকে এই নদীই দুই ভাগ বিভক্ত করেছে। লন্ডনের ৩ ভাগের ২ ভাগ খাবার পানীয় জল যোগান দেয় এই চিরকুমার টেমস।দুই দুটি রূপ: Upper Thames (মিঠা পানি): Thames Head থেকে Teddington Lock পর্যন্ত- এখানে ৪৫ টা লক-গেট দিয়ে জল আটকিয়ে রাখা হয়, মনে পড়ে ফারাক্কা বাঁধের কথা।Tideway (জোয়ার-ভাটা): Teddington হতে সাগর পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার জোয়ারের জল ওঠা-নামা করে এবং লন্ডন ব্রিজে ৭ মিটার পর্যন্ত জোয়ার ওঠে।
শাখা-প্রশাখা: টেমস শুধুই একা না, তার ৩৮ টা প্রধান শাখা প্রশাখা নদনদীর নাতিপুতি আছে। এর ভেতর প্রধানগুলো হলো:
সবচেয়ে মজার একটি তথ্য- আনুমানিক ৩ কোটি বছর আগে টেমস নিজেই ছিল জার্মানির রাইন নদীর একটি শাখা! পরে বরফ যুগে তার গতিপথ বদলে যায় কিন্তু কবি'র মতো দুঃখের নদী বা সাগরের কোনও পরিবর্তন আজও হয়নি।এই নদীটির বেসিন ১২,৯৩৫ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে, যেখানে ১.৫ কোটি মানুষ বসবাস করে থাকে।তবে সুখবর হচ্ছে, টেমস এখন আর বাংলার খাল-বিলের মতো মরা নদী না, ১৯৫০ সালে একে Biologically Dead ঘোষণা করা হয়েছিল, এখন আবার জীবন্ত, ফিরে পেয়েছে জীবন, যা অমর হয়ে থাকবে।এখানে ১২৫ প্রজাতির বিখ্যাত মাছ পাওয়া যায়।ঐতিহাসিক মাছ: Eel (বাইন মাছ) একসময় লন্ডনের গরিব মানুষের প্রধান খাবার ছিল। Eel Pie Island নামে একটা দ্বীপও আছে।
মিঠা পানির মাছ: Trout, Pike, Perch, Carp, Bream, Roach, Dace
সাগরের মাছ (জোয়ারের টানে আসে): Sea Bass, Sole, Flounder, Smelt- এই Smelt মাছটার গায়ে শসার গন্ধ!
আশ্চর্য মাছ: Seahorse (সমুদ্র ঘোড়া), ৩ প্রজাতির হাঙর- Tope, Starry, Smooth hound, Spurdog- এরা এখানেই বাচ্চা দেয়। এমনকি Seal আর Porpoise ও দেখা যায়।
মাঝি ও নৌকা: আগে যারা চালাতো তাদের বলা হতো Watermen- লন্ডনের আসল মাঝি। এখনো তাদের লাইসেন্স আছে। আমাদের দেশে নৌকার মাঝিদের লাইসেন্স লাগে না।
এখন টেমসে চলে: Thames Barge পালতোলা লালপালের ঐতিহ্যবাহী নৌকা।
Houseboat- ভাসমান বাড়ি, বিশেষ করে Brentford আর Tagg's Island এ মানুষ সংসার পাতে, ওখানেই থাকে। বাংলার ভাসমান বেদেপল্লীর কথা লন্ডনেও শুনতে পাওয়া যায়, দেখা যায় তবে উন্নত ও আধুনিক জীবন ব্যবস্থায়।Rowing Boat, Oxford-Cambridge নৌকা বাইচ এই টেমসেই হয়, আমাদের দেশীয় ইতিহাসের সাথে বেশকিছু মিল রয়েছে।Tourist Cruise & Mudlarkers- যারা ভাটার সময় কাদায় পুরনো জিনিস খোঁজে আর আমি খুঁজি স্মৃতি চিহ্ন, মানুষের পদচিহ্ন।তীরের বাড়িঘর ও প্রকৃতি: বাড়িঘর: মধ্য লন্ডনে কাঁচের হাই-রাইজ ফ্ল্যাট, আর উজানে গেলে কাঠের ছোট chalet বাড়ি, দ্বীপের উপর বাংলো। এক একটা দ্বীপে ২-৩ টা বাড়ি মাত্র। আমিও একটি দ্বীপরাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম কিন্তু এ জীবনে তা আর সম্ভব নয়।
গাছপালা: তীর জুড়ে Willow (বেত) আর Osier ঝোপ- আগে এগুলো দিয়ে ঝুড়ি বানানো হতো। উপরের দিকে Goring Gap এ Chalk meadow- সেখানে বুনো Orchid আর Dragonfly বাস করে। আমি যদি বৃক্ষ বা পাখি হতে পারতাম তবে স্বপ্ন পূরণ হতো।
পাখি: রাজহাঁস, Heron (বক), Cormorant, Kingfisher- নীল মাছরাঙা! শত প্রজাতির পাখির মেলা বসে এখানে।টেমস এখন একদিকে লন্ডনের আয়না যাকে ভুলা যায় না, আরেকদিকে জঙ্গল, লুকিয়ে আছে মানুষের মঙ্গল! যদি কখনো সুযোগ হয়, ভোরবেলায় Westminster Bridge থেকে দেখব- একদিকে রাজপ্রাসাদ, আর পানিতে একটা Seal মাথা তুলে আছে, আমাকে দেখে পাখিরাও উড়ে আসবে থাকবে কাছেকাছে।
হে প্রেমা, যেখানে নেই কোনও দাঁড়িকমা মানুষের মতো পৃথিবীর সব নদী প্রকৃতি ও মাটি একই বৃত্তের বহুরূপ সফরনামা। জল বাতাস মাটি হলে তুমি আমার কাছে থেকে দূরে থাকতে পারতে না কভু!"টাঙ্গাইলের বিল পেরিয়ে বংশী নদীর জলে তোমার অশ্রুবারি, সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে গেল লন্ডন ছাড়ি"।
বংশী থেকে টেমস- একফোঁটা জল: যে কবি'র বাড়ির পাশের জন্মদাত্রী বংশী গিয়ে মিশেছে ধলেশ্বরীতে, ধলেশ্বরী মিশেছে তুরাগ হয়ে বুড়িগঙ্গায়, বুড়িগঙ্গা মিশেছে মেঘনায় এবং মেঘনা গিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। আর সেই বঙ্গোপসাগর? সে তো ভারত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর পেরিয়ে আটলান্টিক, আটলান্টিক ঢুকেছে North Sea তে, আর North Sea-ই হলো টেমসের শ্বশুরবাড়ি। তাই তো বংশীতে একটা প্রেমপত্রের কাগজের নৌকা ভাসালে ৬ মাস পর সেটা theoretically টেমসের তীরে Westminster এ গিয়ে ঠেকতে পারে। হে সভ্য এটাই তো কাব্য! তেমনি আমার চোখের জলে পরিপূর্ণ হয় টেমস।
মনে পড়ে কি, ১৮০০ সালে বুড়িগঙ্গার ঘাট থেকেই সোনালি আঁশের পাটের নৌকা যেত কলকাতা, সেখান থেকে জাহাজে করে লন্ডনের টেমস নদীর ডকে। ইংরেজরা যে স্যুট পরতো, তার কাচামালের পাট এসেছে আমার ঘরের আঙ্গিনা বাংলার বুড়িগঙ্গা থেকে। আবার টেমসের পাড়ের সাহেবদের আইন এসে বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসেছিল আদালত!
দুই নদীই রাজধানীর নদী, দুই নদীই দখল আর দূষণে কষ্ট পেয়েছে। বুড়িগঙ্গা যেমন কালো হয়েছে, তেমনি টেমসও ১৮৫৮ সালে The Great Stink হয়ে গেছিল, দুর্গন্ধে তৎকালীন পার্লামেন্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দুই নদীই আবার বাঁচার চেষ্টা করছে। ওরা সফল হয়েছে কিন্তু আমরা সফল হতে পারিনি।
টেমস হতে টরেন্টো: কাব্যিকতায় টেমস নদীকে বাংলার সাথে মিশিয়ে কানাডায় নিয়ে গেলাম।
জলের যাত্রাপথে মিল: টেমস হতে নর্থ সি হতে আটলান্টিক হতে সেন্ট লরেন্স নদী হতে লেক অন্টারিও হয়ে অবশেষে টরন্টো।
আমার ভাবনা তোমরা কি নেবে-
"টেমসের যে জল লন্ডনে আমার গান শুনলো, অশ্রুজলে সিক্ত হলো সেই জল যাবে এঁকেবেঁকে, আটলান্টিক পেরিয়ে অন্টারিও হয়ে টরন্টোর কূলে গিয়ে দেবীরুমার পদতলে চুম্বন দিবে এঁকে"!
"কিভাবে তোমাকে ভুলি; একফোঁটা চোখের জলে টেমস তোমাকে ভাসিয়ে দিয়ে টরেন্টোর হাম্বার, ডন ও রুজ রিভারকে সজীব করে তুলি! তবুও ওরা আমাকে ভুল বুঝে অন্য মানুষ খোঁজে! নিজেকে করিয়া পর বাঁধিছে অন্যের ঘর জানলে না কভু, জোয়ারে জোয়ারে বুকচিঁড়ে বাঁচিয়ে রেখেছি তবু"!
অর এক শায়ের-
"এক হি নাদিয়া কা পানি হ্যায়
বাস নাম জুদা হ্যায়,
ইয়াহাঁ বংশী, ধলেশ্বরী
ওয়াহাঁ হ্যায় টেমস,
হাম্বার, ডন অর রুজ
হার রোজ দেবীরুমা কা নাম
গুণগুণিয়ে কেহতা হ্যায়"।
বঙ্গ নদীতে ভাসিয়ে দিলাম
একটি কাগজের নৌকা,
তাতে লেখা ছিল টেমসরুমার নাম
ধলেশ্বরী বললো, ওকে নিয়ে যাও,
তুরাগ পাড় করে দিল
বুড়িগঙ্গা বললো, একটু থাম
লঞ্চের যানযট,
সদরঘাটের ভীড় ঠেলে এগুচ্ছে
হঠাৎ করে মেঘনা বললো
তুই তো বড় ছোট্ট রে,
তোকে নিয়ে বিশাল ও উত্তাল সাগর-
পারি দেব কী করে?
বঙ্গোপসাগর হেসে বলল
আয়, আমার কাছে আয়
ভারত মহাসাগর তো
আমারই রক্তের ভাই
কোনও সমস্যা হবে না, বুঝলে।
এভাবেই আটলান্টিক পার হয়ে
ঘনকুয়াশা ঠেলে, ভেদ করে
প্রিয় সেই ক্ষুদ্র প্রেমের তরী-
নৌকাটা লন্ডনে নঙ্গর করল।
Westminster Bridge এর নিচে দাঁড়িয়ে
এক বাবু সাহেব বলবেন
এ চিঠিটি কার? কোথা থেকে এসেছে?
আমি বলব, এটা বংশী বিলের,
এটা গাঁয়ের, আমার দিলের।
যেখানে বংশী কাঁদে বর্ষায়,
টেমস কাঁদে লন্ডনের কুয়াশায়;
আমি তোমাদের একজন।
লন্ডনের মেয়রকে বললাম-
কবি'র কণ্ঠে রেকর্ড করলে-
টেমস আর বংশী দুই নদীই শুনবে।
তুমি ব্যবস্থা করে দাও।
কবি শান্তি পাবে, আত্মতৃপ্ত হবে,
ব্রিটিশ রাজদরবার সবকিছু শুনে
কবি যা চায় তাই করল
হুকুম জারী করল
নহে কোনও রবি-
মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু
আজ থেকে টেমস নদীর কবি!
সভাপতি
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৪ রবউসি সানি ১৪৪৮