তাজুল ইসলাম প্রধান,তাজাখবর২৪.কম, গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা): মাঠে ফসল দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, কিন্তু সেই ফসলের মালিকের বুকে হাত দিলে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার শব্দ শোনা যায়। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান ‘শস্যভাণ্ডার’ খ্যাত গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা। করতোয়া ও বাঙালি নদীর অববাহিকার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের খেতগুলো এখন ফসলে ভরা থাকলেও, চাষিদের ঘরে ঘরে চলছে বোবা কান্না। সার ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং আকাশছোঁয়া উৎপাদন খরচের বিপরীতে আলু, ধান ও লাউ সবজির লাগাতার দরপতন গোবিন্দগঞ্জের লাখ লাখ প্রান্তিক চাষিকে সর্বস্বান্ত করে তুলেছে। একদিকে ডিলারদের সার মজুত ও কৃত্রিম সংকট, অন্যদিকে সেচ দিতে না পেরে খেত শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম—এই দ্বিমুখী আগুনে পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন।
সারের বাজারে ডিলার সিন্ডিকেট গোবিন্দগঞ্জের খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সার মিলছে না সময়মতো। অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অবৈধভাবে সার মজুত করে রাখছেন।কৃষকদের বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ৩-৪ শত টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। সারের অভাবে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও সেচের খরচরবি ও বোরো মরসুমে যখন খেতে সবচেয়ে বেশি পানি প্রয়োজন, তখনই ঘন ঘন লোডশেডিং এবং প্রিপেইড মিটারে অতিরিক্ত টাকা কাটার জটিলতায় সেচ পাম্পগুলো বন্ধ থাকছে।বিদ্যুৎ না থাকায় চড়া দামের ডিজেল কিনে শ্যালো মেশিন চালাতে হচ্ছে। এতে বিঘাপ্রতি সেচের খরচ এক ধাক্কায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়ে গেছে।গোবিন্দগঞ্জে এ বছর প্রচুর আলু উৎপাদিত হলেও হিমাগারগুলোতে (কোল্ড স্টোরেজ) আলু রাখার কার্ড বা স্লিপ নিয়ে চলছে চরম হাহাকার ও সিন্ডিকেট।কার্ড সংকটের কারণে অনেক চাষি হিমাগারে আলু ঢোকাতে পারেননি। খোলা বাজারে আলুর দরপতন হওয়ায় উৎপাদন খরচও উঠছে না।লাউ ও ধানের পানির দরস্থানীয় মহিমাগঞ্জ, পানিতলা কিংবা ফাঁসিতলা বাজারে পাইকারিতে একটি বড় লাউ মাত্র ৫ থেকে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধানের বাজারেও মিলার আর ফড়িয়াদের একচেটিয়া সিন্ডিকেট।১ বস্তা ধান বিক্রি করে ১ বস্তা সার কেনা যাচ্ছে না। লাউয়ের দাম এতটাই কম যে, খেত থেকে তোলার শ্রমিকের মজুরিও উঠছে না।
দাদনের ফাঁদ ও পেশা বদলের কালো ছায়া গোবিন্দগঞ্জের অধিকাংশ প্রান্তিক চাষি স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে কিংবা এনজিওর ঋণ নিয়ে আলু সবজি ও ধানের চাষ করেছিলেন। ফসল বিক্রি করে এখন আসল টাকাই উঠছে না, ঋণের কিস্তি শোধ হবে কীভাবে? দরপতনের ধাক্কা সইতে না পেরে কামারদহ, কামদিয়া, কাটাবাড়ি, নাকাই বা হরিরামপুরের অনেক কৃষক পরিবার এখন ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে।পেটের দায়ে অনেকে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে ঢাকা বা বগুড়া শহরে গিয়ে রিকশা চালানো কিংবা দিনমজুরির মতো কঠিন পথ বেছে নিচ্ছেন।উত্তরবঙ্গের এই বিশাল কৃষি অঞ্চলে কৃষকের এই বিপর্যয় দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় বিপদ সংকেত। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে গোবিন্দগঞ্জের সারের বাজার শতভাগ সিন্ডিকেন্দ মুক্ত করা, সেচ কাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া এবং হিমাগারগুলোতে প্রান্তিক চাষিদের আলু সংরক্ষণের কার্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরাসরি সবজি বিক্রি নিশ্চিত করা না হলে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮