কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনে সম্প্রীতির মিলন মেলা
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১৬ পিএম  (ভিজিট : )
কক্সবাজার সমুদ্র  সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনে সম্প্রীতির মিলন মেলা

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনে সম্প্রীতির মিলন মেলা

মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী,তাজাখবর২৪.কম, 
কক্সবাজার প্রতিনিধি: শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুর থেকে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে শুরু হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন আয়োজন। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে আনা হয় প্রতিমা।পাঁচ দিনের পূজা, আনন্দ ও মিলনমেলার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। বিদায়ের মুহূর্তে ভক্তদের প্রার্থনা সব অশুভ দূর করে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আবারও ফিরে আসবেন মা দুর্গা।

বুধবার বিকেলে লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকবোঝাই করে প্রতিমা নিয়ে আসছেন পূজার্থীরা। লাবণী পয়েন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাক-ঢোল, উলুধ্বনি আর ভক্তদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে সৈকত। প্রতিমা বিসর্জনের পাশাপাশি হাজারো পর্যটক ও দর্শনার্থী সমুদ্রস্নান, ঘোড়ায় চড়া, বিচবাইক ও সৈকত ভ্রমণে ব্যস্ত সময় কাটান।এবার বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে কক্সবাজার সৈকতে অন্তত ৪০০ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ আয়োজন দেখতে তিন থেকে চার লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে।

চকরিয়া ও পেকুয়ার মণ্ডপগুলোর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় মাতামুহুরী নদীতে। অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিমা এনে বিসর্জন দেওয়া হয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে।

ছুটিতে পর্যটকের ঢল :
দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমার টানা ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নেমেছে। হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজে বেড়েছে অতিথির চাপ। হোটেলমালিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত অনেক হোটেলেই শতভাগ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে।
দুর্গাপূজার ছুটি উপলক্ষে কয়েক দিন ধরেই কক্সবাজারে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ছিল। তবে মঙ্গলবার থেকে সেই চাপ আরও বেড়েছে। বুধবার বিকেলে লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায়, সৈকতের বালুচর পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। একইভাবে হিমছড়ি, ইনানী ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও বাড়ছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা।

নানা শঙ্কা কাটিয়ে এবার দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে কক্সবাজার। বিশেষ করে মেরিন ড্রাইভ এলাকার তুলনায় শহরের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজগুলোতে অতিথির চাপ বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
হোটেলমালিকদের ভাষ্য, গত ১৭ অক্টোবর ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হলে পর্যটকের আগমন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে গত দুই দিনে সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। বেড়েছে পর্যটকের উপস্থিতি।দুর্গাপূজা, সাপ্তাহিক ছুটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি মিলিয়ে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০ দিনের ছুটি চলছে। এ সময়ে কক্সবাজারে অন্তত ১৫ লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এ সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

শতভাগ বুকিং, ছাড় নেই কক্ষভাড়ায় : কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, বুধবার লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসবকে কেন্দ্র করে তিন দিনে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। সব মিলিয়ে ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১৫ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসবেন বলে তাঁরা আশা করছেন।তিনি বলেন, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলে প্রায় শতভাগ কক্ষ এবং মাঝারি আকারের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজে প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। এবার কক্ষভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রশাসন তদারকি করছে।

শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে একসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি।হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব বলেন, তাঁদের হোটেলের সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অতিথির চাপ থাকবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, ১০ দিনের ছুটিতে ১৫ লাখ পর্যটকের সমাগম হলে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই ধর্মীয় উৎসবের শেষ দিনটি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিজয়া দশমীর আয়োজন পরিণত হয়েছে সার্বজনীন উৎসবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে অংশ নেন।কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা শাফায়াত জামিল বলেন, ‘বিজয়া দশমী এখন শুধু হিন্দুদের নয়, এটি বাঙালির একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে। 

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শনিবার রাতে কক্সবাজারে আসেন। তিনি বলেন, সুগন্ধা সৈকতে মানুষের ভিড় দেখে পরিবার নিয়ে লাবণী পয়েন্টে এসেছি। এখানেও হাজারো মানুষের সমাগম দেখলাম।সিরাজগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা স্কুলশিক্ষক রাজেন্দ্র রায় বলেন, ‘কক্সবাজারের আয়োজনটাই সারাদেশে বড়। তাই এখানে ছুটে এসেছি মাকে বিদায় দিতে। প্রশাসনও ভালো কাজ করছে।

নিরাপত্তায় কঠোর  প্রশাসন :
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় বৃহৎ এই আয়োজন সফলভাবে শেষ হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ এই দিনে কক্সবাজারে এসে জড়ো হয়েছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের আয়োজন শেষ হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের ঐতিহ্য। এই সম্প্রীতি অটুট রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের মতো পর্যটন নগরীতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করাও সবার দায়িত্ব।

এবার কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি এবং টেকনাফে ৬টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পাঁচ দিনের পূজা শেষে বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। তবে ভক্তদের প্রত্যাশা অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন মা।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩, ০৮ জমাদিউল আউয়াল  ১৪৪৮

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝