বিশ্ব সেরেব্রাল পালসি দিবস আজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৮ এএম  (ভিজিট : )
 ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

তাজাখবর২৪.কম,ডেস্ক নিউজ: একটি শিশুর প্রথম হাসি, প্রথম বসা, প্রথম হাঁটা—প্রতিটি মুহূর্তই পরিবারের জন্য আনন্দের। কিন্তু সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে এই আনন্দের সঙ্গে শুরু হয় দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পথ। বয়স বাড়লেও অনেক শিশু বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারে না। কারও কথা বলতে সমস্যা হয়, কারও আবার হাত-পায়ের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অনেকের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কিংবা খিঁচুনির মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।তবে সেরিব্রাল পালসি মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। যথাসময়ে শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, নিয়মিত থেরাপি এবং পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে আক্রান্ত শিশুরাও নিজেদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।আজ ৬ অক্টোবর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। এ বছরের আন্তর্জাতিক প্রচারের মূল বার্তা—সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ৫ কোটি মানুষের কণ্ঠকে একত্র করে পরিবর্তনের দাবি জোরালো করা। দিবসটির লক্ষ্য আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা।বাংলাদেশে দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হচ্ছে।

কেন হয় সেরিব্রাল পালসি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেরিব্রাল পালসি মূলত শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বিকাশ বা মস্তিষ্কে ক্ষতির কারণে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জন্মের আগে, জন্মের সময় অথবা জন্মের পরপরই মস্তিষ্কে ক্ষতির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে।

বিশ্ব সেরেব্রাল পালসি দিবস আজ 
অপরিণত বা কম ওজন নিয়ে জন্ম, জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নবজাতকের কিছু সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. মো. বরুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, সেরিব্রাল পালসির সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা। কারও পেশি শক্ত হয়ে থাকে, কারও অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হয়, আবার কারও শরীরের ভারসাম্য ও সমন্বয় করতে সমস্যা হয়।তিনি আরও বলেন, সেরিব্রাল পালসি শুধু চলাফেরার সমস্যা নয়। আক্রান্ত শিশুর কথা বলা, গিলতে পারা, খাওয়া, দেখা, শোনা কিংবা শেখার ক্ষেত্রেও সমস্যা থাকতে পারে।

দ্রুত শনাক্তকরণ জরুরি
শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের ধাপ সম্পর্কে পরিবারের সচেতনতার অভাবে অনেক সময় সেরিব্রাল পালসি শনাক্ত হতে দেরি হয়। যে শিশু নির্দিষ্ট বয়সে মাথা ধরে রাখতে পারছে না, বসতে পারছে না, হামাগুড়ি বা দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে না, এক পাশের হাত-পা বেশি ব্যবহার করছে কিংবা শরীর অস্বাভাবিক শক্ত বা ঢিলে—এসব লক্ষণকে অনেক সময় পরিবার স্বাভাবিক বিকাশের অংশ বলে মনে করে।কেউ কেউ আবার ভাবেন, বয়স বাড়লে শিশু ঠিক হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপেক্ষায় মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে। কারণ শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় থেরাপি ও সহায়তা শুরু করা যায়, শিশুর কার্যক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তত বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন
সেরিব্রাল পালসির জন্য এমন কোনো একক চিকিৎসা নেই, যা সব শিশুকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলবে। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যথা ও জটিলতা কমানো এবং তাকে যতটা সম্ভব স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে সক্ষম করা।এ জন্য প্রয়োজন হতে পারে ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়ানোর থেরাপি, কথা বলা ও ভাষা শেখার থেরাপি, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, সহায়ক যন্ত্র, হুইলচেয়ার, দৃষ্টি ও শ্রবণ পরীক্ষা এবং খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। কিছু ক্ষেত্রে হাড় ও অস্থিসন্ধির অস্ত্রোপচারও প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসা পেতে ভোগান্তি
তবে বাংলাদেশে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা পেতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষায়িত পুনর্বাসন ও শিশু স্নায়ুরোগের বড় অংশের সেবা রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পরিবারগুলোকে অনেক সময় চিকিৎসা ও থেরাপির জন্য ঢাকায় আসতে হয়।নিয়মিত থেরাপির খরচের পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা, অভিভাবকের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং অন্যান্য ব্যয়ও পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এই ব্যয় বহন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শুরুতে নিয়মিত থেরাপি করালেও কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর অনেক পরিবার তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ এস এম মাহমুদুজ্জামান শোয়েব গণমাধ্যমকে বলেন, সেরিব্রাল পালসি মূলত দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিষয়। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস থেরাপি করালেই সব সমস্যা দূর হয়ে যায়—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি আরও বলেন, শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে থেরাপির ধরন ও লক্ষ্যও পরিবর্তিত হতে পারে। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ না থাকলে পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, অস্থিসন্ধির নড়াচড়ার সীমাবদ্ধতা, অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি, ব্যথা এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।তার মতে, শুধু হাসপাতাল বা থেরাপি কেন্দ্র বাড়ালেই হবে না। পরিবারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ঘরেও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা কম, শিশু পুনর্বাসনের সুযোগও সীমিত। একই সঙ্গে ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়ানোর থেরাপি ও কথা বলার থেরাপির সমন্বিত সেবাও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে একই জায়গায় সব ধরনের সেবা পাওয়ার সুযোগ কম।

পরিবারের ওপরও বাড়ে চাপ
সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশু রক্তিমের মা ইশরাত জাহান (ছদ্মনাম) গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত একটি শিশুর যত্নের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে মায়ের ওপরই পড়ে। শিশুর দৈনন্দিন কাজ, খাওয়ানো, গোসল, পোশাক পরানো, থেরাপিতে নিয়ে যাওয়া—সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেক মাকে চাকরি বা আয়মূলক কাজ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। আমার নিজেকেও চাকরি ছাড়তে হয়েছে বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে।’

শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় তাদের নিয়ে করুণা করা হয়, দূরে সরিয়ে রাখা হয় কিংবা তাদের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এমনকি কিছু পরিবারও মনে করে, সন্তানটি কিছুই করতে পারবে না।এর ফলে শিশুর শিক্ষা, খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সম্ভাবনা শুরুতেই সীমিত হয়ে যায়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশুদের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত সহযোগিতা। সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ, সহজলভ্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা গেলে শরীরের সীমাবদ্ধতা কোনো শিশুর স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৪ রবউসি সানি ১৪৪৮

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝