তাজাখবর২৪.কম,ডেস্ক নিউজ : গর্ভাবস্থায় অনেক নারী হঠাৎ কিছু বিষয় ভুলে যাওয়ার সমস্যায় পড়েন। রান্নাঘরে গিয়ে কেন গিয়েছিলেন মনে না থাকা, কাউকে ফোন করতে গিয়ে কাকে ফোন করবেন ভুলে যাওয়া কিংবা কোনো জিনিস খুঁজতে পাশের ঘরে গিয়ে কী খুঁজছিলেন তা মনে না থাকার মতো ঘটনা এ সময় বেশ পরিচিত।অনেকে বিষয়টিকে মমোনেশিয়া, মমি ব্রেইন, প্রেগন্যান্সি ব্রেইন বা বেবি ব্রেইন নামে অভিহিত করেন। তবে এতদিন এর পেছনের সঠিক কারণ পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না। এবার এ বিষয়ে সম্ভাব্য একটি ব্যাখ্যা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।সম্প্রতি সায়েন্স বুলেটিন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকার কারণে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট একটি স্নায়ুপথের কার্যক্রমে পরিবর্তন হতে পারে। এর ফলে সাময়িকভাবে স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল হতে পারে।
ইস্ট্রোজেনের সঙ্গে স্মৃতিশক্তির সম্পর্ক
গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের অন্তঃস্রাববিদ্যা ও অণুজীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. ঝেং সান এবং যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির পেনিংটন বায়োমেডিক্যাল গবেষণা কেন্দ্রের মস্তিষ্কবিষয়ক গবেষণাগারের পরিচালক ও গবেষণাটির সহলেখক ডা. ইয়ানলিন হে।গবেষণার একটি বড় অংশ চালানো হয় ইঁদুরের ওপর। গর্ভাবস্থায় শরীরে যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দেখা যায়, পরীক্ষায় ইঁদুরের শরীরেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এতে ইঁদুরগুলোর সাময়িক স্মৃতিশক্তি কমে যায়। তবে তাদের মেজাজে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।গবেষকেরা দেখেন, এই পরিবর্তনের পেছনে মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে থাকা একটি স্নায়ুপথের ভূমিকা রয়েছে। এর একটি হলো হাইপোথ্যালামাস, যা শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য সমন্বয়ে ভূমিকা রাখে। অন্যটি হিপোক্যাম্পাস, যা স্মৃতি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়লে হাইপোথ্যালামাসের কিছু স্নায়ুকোষের কার্যক্রম বেড়ে যায়। এর ফলে হিপোক্যাম্পাসের কার্যক্রম কমে যেতে পারে এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
শেষ দিকে সমস্যা বেশি
অধ্যাপক ঝেং সান জানান, গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এ ধরনের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সন্তান জন্মের পরও কিছু সময় এটি থাকতে পারে। তবে সাধারণত সন্তান জন্মের পর ধীরে ধীরে এই সমস্যা কমে যায়।তার মতে, এতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের স্মৃতিই কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে। কোনো নাম বা শব্দ মনে করতে সমস্যা হওয়া, পরিচিত তথ্য মনে করতে কষ্ট হওয়া কিংবা কোনো জায়গা, মানুষ বা সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য মনে করতে অসুবিধা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।তবে এটি গুরুতর কোনো সমস্যা নয় এবং সাধারণত চিকিৎসাগতভাবে অক্ষম করে দেওয়ার মতো অবস্থাও তৈরি করে না। তবে দৈনন্দিন কাজকর্ম ও আত্মবিশ্বাসে এর প্রভাব পড়তে পারে।কোনো ঘরে গিয়ে কেন গিয়েছেন তা ভুলে যাওয়া, কোনো জিনিস কোথায় রেখেছেন মনে না থাকা, কথোপকথনের মাঝখানে কী বলছিলেন তা ভুলে যাওয়া কিংবা কোনো নির্ধারিত কাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হওয়া—এসব এর সাধারণ উদাহরণ।
৮০ শতাংশ নারীর এমন অভিজ্ঞতা
অধ্যাপক সান বলেন, প্রায় ৮০ শতাংশ গর্ভবতী নারী এ ধরনের পরিবর্তন অনুভব করেন। তবে এই পরিসংখ্যান মূলত নারীদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বস্তুনিষ্ঠ স্মৃতিশক্তি পরীক্ষার ফলের ওপর এটি পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়।গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, গর্ভাবস্থায় এ ধরনের স্মৃতির পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে একজন নারীর সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যায়।গবেষণাটির সহলেখক ডা. ইয়ানলিন হে বলেন, গর্ভাবস্থা কাউকে কম বুদ্ধিমান করে তোলে না। বরং এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ম এবং নির্দিষ্ট কিছু ধরনের চিন্তাশক্তি বা স্মৃতিনির্ভর কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে এই স্নায়ুপথ
ইস্ট্রোজেন এমন একটি হরমোন, যা গর্ভাবস্থা, মাসিক চক্র ও বয়ঃসন্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় এর মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে এবং শেষ তিন মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।গবেষকেরা দেখেছেন, ‘ইস্ট্রোজেন রিসেপ্টর আলফা’ নামের একটি প্রোটিন হাইপোথ্যালামাসের কোষে ইস্ট্রোজেনের সংকেত পৌঁছে দেয়।হাইপোথ্যালামাসে থাকা অনেক স্নায়ুকোষ সাধারণত মস্তিষ্কের অন্য অংশে নিয়ন্ত্রণকারী সংকেত পাঠায়। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি হলে ইঁদুরের এসব স্নায়ুকোষের কার্যক্রম অতিরিক্ত বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হিপোক্যাম্পাসে।
ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি যাচাই করতে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হয়। এর মধ্যে কোনো বস্তু এবং সেটি কোথায় ছিল, তা মনে রাখার পরীক্ষাও ছিল। উচ্চ মাত্রার ইস্ট্রোজেন পাওয়া ইঁদুরগুলোর স্মৃতিশক্তি অন্য ইঁদুরের তুলনায় দুর্বল দেখা যায়।পরে গবেষকেরা হাইপোথ্যালামাস থেকে হিপোক্যাম্পাসে যাওয়া ওই স্নায়ুপথের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তখন ইস্ট্রোজেনের কারণে তৈরি স্মৃতির সমস্যা আর দেখা যায়নি।আবার ওই স্নায়ুপথকে পরীক্ষামূলকভাবে সক্রিয় করলে ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এমনকি শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা না বাড়ালেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।অধ্যাপক সান জানান, ইঁদুরের হাইপোথ্যালামাসের এসব স্নায়ুকোষ থেকে ইস্ট্রোজেন গ্রহণকারী প্রোটিন সরিয়ে দেওয়ার পর ইস্ট্রোজেন ও গর্ভাবস্থাজনিত স্মৃতির সমস্যাও দূর হয়ে যায়।
৭০ নারীর ওপরও চালানো হয় পরীক্ষা
ইঁদুরের পরীক্ষার পাশাপাশি গবেষকেরা ৭০ জন নারীর স্মৃতিশক্তিও মূল্যায়ন করেন। তাদের মধ্যে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের নারী এবং গর্ভবতী নন এমন নারীও ছিলেন।দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি ও কার্যকরী স্মৃতিশক্তি যাচাই করতে তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, গর্ভাবস্থার শেষ দিকে নারীদের স্মৃতিশক্তিতে কিছুটা দুর্বলতা দেখা দেয়। একই সময়ে তাদের রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রাও বেশি ছিল।অধ্যাপক হে বলেন, রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকার সঙ্গে স্মৃতিসংক্রান্ত কয়েকটি পরীক্ষায় নেতিবাচক ফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্য সম্ভাব্য কারণগুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক দেখা গেছে।
মানুষের ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের ক্ষেত্রে এই স্নায়ুপথের কার্যক্রম সরাসরি পরিবর্তন বা পরিমাপ করা হয়নি। ফলে নারীদের ওপর পাওয়া ফলাফল ইঁদুরের পরীক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, মানুষের ক্ষেত্রে ইঁদুরের পরীক্ষার মতো সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত হয়নি।অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় ভুলে যাওয়ার সঙ্গে ইস্ট্রোজেন ও মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের সম্পর্কের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও, বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩, ১১ রবউিস সানি ১৪৪৮