কিশোর বয়স থেকেই গান করেন বহুল জনপ্রিয় বাউল সালাম সরকার, ২ হাজারের অধীক গান তার, আজও মেলেনি সরকারি স্বীকৃতি
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৪ পিএম আপডেট: ১২.০৯.২০২৬ ১:৩৮ পিএম  (ভিজিট : )
বাউল সালাম সরকার

বাউল সালাম সরকার

রাখাল বিশ্বাস,তাজাখবর২৪.কম,কেন্দুয়া (নেত্রকোণা): জীবন মানেই তো যন্ত্রনা,বেঁচে থাকতে বোধ হয় শেষ হবে না/ কি সুন্দর এক গানের পাখি মন নিয়ে সে খেলা করে/আমি পারি না আর পারি না,আমি কেন মরি না,আজরাইল কি আমারে চিনে না/ গানই আমার জীবন রে বন্ধু গানই আমার জীবন ---- এমন বহু কালিজয়ী গানের স্রষ্টা বাউল সালাম সরকার।তার বহু অডিও ক্যাসেট আছে বাজারে। শুক্রবার  কথা হয় তার সাথে।বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। দিনের ব্যস্ততা কমে এসেছে চারপাশে। সেই নীরবতার মধ্যেই কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে পড়েন তিনি। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় দেয় না। হাতেও এসেছে ক্লান্তি। সংসারের অভাব-অনটন, জীবনের নানা টানাপোড়েনও আছে। তবু কলম থামে না তার।কখনো কাগজের পাতায় শব্দ সাজান,কখনো সেই শব্দে সুর বসান,নিজেই মিউজিক করেন। আবার কখনো আনমনে গেয়ে ওঠেন নিজেরই লেখা গান। মনে হয়, বয়স তার শরীরটাকে ছুঁয়েছে; কিন্তু গানকে ছুঁতে পারেনি।তিনি বাউল কবি সালাম সরকার। নেত্রকোনার কেন্দুয়ার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিজ বাড়িতে বসেই যিনি এখনো গান লিখে চলেছেন। তিন দশকের বেশি সময়ের সংগীতসাধনায় তার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে দুই হাজারেরও বেশি গান। প্রেম-বিরহ থেকে শুরু করে আধাত্মবাদসহ গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, মানুষের সম্পর্ক, সমাজের বাস্তবতা সবই জায়গা পেয়েছে তার গানে।

মানুষের মনের কথাই যেনো বলেছেন তিনি গানে গানে। এখানেই হয়তো তার গানের শক্তি।তার গানের কথা,সুর লয় তাল সবই যেনো সাধারণ মানুষের অন্তরের অব্যক্ত কথা।বাউল সালাম সরকার ১৯৬৭ সালের ৪ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। জন্মভূমি মদন হলেও জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে কেন্দুয়ায়। সেই কিশোর বয়স থেকেই কেন্দুয়াকেই বেছে নিয়েছেন তার গানের সাধনস্থল হিসেবে। এখানেই সংসার পেতেছেন সামছুন্নাহারের সাথে। স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে কেটেছে জীবনের বড় একটি অধ্যায়।সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন, বিনোদনের ধরণ, গান শোনার মাধ্যম। কিন্তু সালাম সরকারের গানের জগৎ বদলায়নি। এখনো তার ভাবনার বড় অংশজুড়ে শুধুই গান। তাও আবার লোকসংগীত। ।  তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লিখেছেন বাউলগান-লোকগান। তার লেখা গান গেয়েছেন দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান ও নবীন শিল্পী।দেশের বাহিরের শিল্পীরাও তার গান করেন। সহজ-সরল ভাষায় লেখা এসব গান গ্রামীণ মানুষের হৃদয়কে খুব কাছে টানে। প্রেমের আকুলতা, বিচ্ছেদের কষ্ট, মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, জীবনের সুখ-দুঃখ সবকিছুই যেন চেনা কোনো গল্পের মতো উঠে আসে তার গানের কথায়। এ কারণেই হয়তো তার গান শুধু মঞ্চে আটকে থাকেনি। 

শিল্পীর কণ্ঠ পেরিয়ে পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের কাছে। পথে ঘাটে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের কণ্ঠে শোনা যায় তার গান। কিন্তু এত দীর্ঘ পথচলার পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির তালিকায় নাম ওঠেনি এই বাউল কবির।একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা এখনো তার নাগালের বাইরে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা লোকসংগীতে অবদান রেখে চলা এই শিল্পীর এমন অবস্থায় আক্ষেপ রয়েছে তার ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে।স্থানীয়দের দাবি, জনপ্রিয়তা কিংবা পরিচিতির বিচারে নয়, তার দীর্ঘ সংগীতসাধনা ও সৃষ্টিকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হলেও রাষ্ট্র যেন এই প্রবীণ শিল্পীর অবদানের স্বীকৃতি দেয় এটাই তাদের প্রত্যাশা। তবে সালাম সরকারের নিজের কথা, তার কোনো অভিযোগ নেই। পুরস্কার বা রাষ্ট্রীয় সম্মাননার হিসাব কষে তিনি গান করেননি। গান তার কাছে নেশার মতো।পেশার চেয়েও বেশি কিছু এ যেন জীবনযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।বর্তমান জীবনের বাস্তবতা অবশ্য কঠিন। বয়স বেড়েছে। সংসারের প্রয়োজন বেড়েছে। জীবনের শেষভাগে এসে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে তাকে। তারপরও গান ছাড়েননি।তিনি বলেন,‘জীবনে ভক্তদের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার জন্যই হয়তো এখনো বেঁচে আছি। এখনো গান লিখছি এবং গাইছি। নতুন নতুন আরও গান উপহার দেওয়ার চেষ্টা করছি’ যেনো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গান লিখে গেয়ে যেতে পারি বলেন এই দোয়া চাই সকলের কাছে।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুললে তার কণ্ঠে কোন রকম ক্ষোভ শোনা যায় না। বরং আছে দীর্ঘ অপেক্ষার শান্ত স্বর। তিনি বলেন, ‘পুরস্কার বা সম্মাননার আশায় গান করিনি। গান আমার জীবন। জীবনের তাগিদেই গান করি। তবে সরকার যদি আমাকে যোগ্য মনে করে তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে আমি সেই অপেক্ষাতেই আছি। এই অপেক্ষা কত দীর্ঘ হবে, তার উত্তর কারও জানা নেই।একসময় যে কণ্ঠে নতুন গানের সুর প্রতিনিয়ত জন্ম নিত, বয়সের ভারে আজ সেই কণ্ঠ কিছুটা ধীর। শরীর ক্লান্ত , এখন বিশ্রাম চায়। কিন্তু মনের ভেতর গান এখনো জেগে থাকে। তাই সুযোগ পেলেই কাগজ-কলম নিয়ে বসেন তিনি। তার কাছে গান হয়তো খ্যাতির সিঁড়ি নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রেরণা। দুই হাজারের বেশি গান লেখার পরও নতুন গানের জন্য তার ভেতরে শব্দেরা ভিড় করে,সুরেরা হাতছানি দেয়, বাদ্যরা আহ্বান করে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে থামাতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাকে ছুঁয়ে যায়নি, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা তার পাথেয়। জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে তাই সালাম সরকারের গল্পটি শুধু একজন বাউল কবির গল্প নয়; এটি একজন সৃষ্টিশীল মানুষের লড়াইয়ের গল্প। অভাব তাকে ক্লান্ত করেছে, বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু গানকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি।

কেন্দুয়ার সেই শ্রীহীনঘরে আজও কখনো কাগজে শব্দ নামে, কখনো সুর ভেসে ওঠে। হয়তো কোনো একদিন সেই সুর পৌঁছে যাবে রাষ্ট্রের দরজাতেও।ততদিন পর্যন্ত জীর্ণ ঘরে বসেই গান লিখে যাবেন সালাম সরকার। গান থামেনি তার। শুধু বদলে গেছে জীবনের সুর। তবু ভক্তদের হৃদয়ে গানের পাখি হয়েই বেঁচে থাকতে চান বাউল সালাম সরকার।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝