কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ: জেলা প্রশাসকসহ চারজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ
মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী,তাজাখবর২৪.কম,কক্সবাজার: কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণকাজ শুরুর অভিযোগে জেলা প্রশাসকসহ চারজনকে আদালত অবমাননার আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বালিয়াড়ির ওপর চলমান নির্মাণকাজ বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়েছে নোটিশে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।নোটিশ পেলেন - কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক রাশিদুর রহমান, কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আদনান চৌধুরী এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি তাকাহাসকি জানকো।
গতকাল বুধবার (২৬ আগস্ট)
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এ আইনি নোটিশ দেন। তিনি জানান, নোটিশটি সংশ্লিষ্টদের ই-মেইল ও ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে।নোটিশে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য নষ্ট করার অভিযোগে জনস্বার্থে এইচআরপিবির পক্ষ থেকে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল। ওই রিটের শুনানি শেষে ২০১১ সালে আদালত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য রক্ষা এবং বালিয়াড়িতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করার নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের আদেশে বালিয়াড়িতে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনাও দুই দফায় অপসারণ করা হয়।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ: জেলা প্রশাসকসহ চারজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ
আইনি নোটিশে আরও বলা হয়, আদালতের ওই নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় কক্সবাজার পৌরসভার উদ্যোগে ও জাইকার অর্থায়নে সৈকতের বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে নতুন করে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং অতীতে আদালতের আদেশে বালিয়াড়ির স্থাপনা অপসারণের নজির থাকার পরও সেখানে সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা আদালতের আদেশ লঙ্ঘন ও আদালত অবমাননার শামিল।এতে বলা হয়, বালিয়াড়ির ওপর সড়ক নির্মাণের ফলে সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ, বালিয়াড়ি ও সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে প্রকল্পটির কাজ বন্ধের দাবিতে গত রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সংগঠনটির অভিযোগ, পরিবেশ আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, কক্সবাজার সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে সরকার প্রণীত কক্সবাজারের মহাপরিকল্পনায় জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী লাইন থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই।তিনি বলেন, সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট ও দখল করে সড়ক নির্মাণ অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এ কার্যক্রম বন্ধ করা না হলে কঠোর আন্দোলন করা হবে।এদিকে বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরও প্রকল্প পরিচালক ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত তলব করেছে। গত শনিবার পাঠানো নোটিশে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিপত্র উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) অধিভুক্ত সমুদ্রসৈকতে বড় ধরনের সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।অন্যদিকে পরিবেশ আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণের কাজ কেন বন্ধ করা হবে না এ বিষয়ে গতকাল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) পৃথক আইনি নোটিশ দিয়েছে। দুই সচিবসহ আট সরকারি কর্মকর্তাকে এ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তবে কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া দাবি করেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই সুগন্ধা সৈকতে শহর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি আগেই একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। জরিপ-নকশা, গবেষণা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকলে প্রকল্পটি একনেকে কীভাবে অনুমোদন পেল এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।রুমেল বড়ুয়া জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলীর সায়মন বিচ রিসোর্ট পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার ‘শহর রক্ষা বাঁধের’ কাজ শুরু হয়েছে। বাঁধের সঙ্গে সড়কের প্রস্থ হবে ২৮ মিটার। এ কাজের জন্য জাইকা ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
পৌরসভার এ প্রকৌশলী জানান, প্রথম ধাপের কাজ শেষ হলে সায়মন বিচ রিসোর্ট থেকে দক্ষিণ দিকে বেলি হ্যাচারি পর্যন্ত আরও ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপের কাজেও শতকোটি টাকা প্রয়োজন হবে। মানুষের প্রয়োজন এবং সমুদ্রের ভাঙন থেকে উপকূল রক্ষার স্বার্থেই পৌরসভা এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এতে পরিবেশের তেমন ক্ষতি হবে না।প্রথম ধাপের প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ নিয়ে একদিকে আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ, অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আপত্তি, সব মিলিয়ে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, বালিয়াড়ি নষ্ট হলে সৈকতের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও উপকূলীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮