প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম (ভিজিট : )
বিশ্ব হাতি দিবস আজ
তাজাখবর২৪.কম,ডেস্ক নিউজ: শেরপুরে মানুষ ও বন্য হাতির দ্বন্দ্ব দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বন-জঙ্গল কমে যাওয়া, মানুষের বসতি বৃদ্ধি এবং খাবার ও পানির সংকটে লোকালয়ে নেমে আসছে হাতির পাল। গত ১১ বছরে এ দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৩৯টি হাতি ও ৩৬ জন মানুষের।আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘হাতি রক্ষায় বিশ্বকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে’। এ দিনে হাতি রক্ষা ও তাদের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে গারো পাহাড়ের বন্য হাতিগুলোও এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে রয়েছে।
গভীর রাতে হঠাৎ গাছ ভাঙার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় পাহাড়ের মানুষের। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখা যায়, একদল বন্য হাতি লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। এরপর মশাল জ্বালিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে ও চিৎকার করে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন স্থানীয়রা। কখনো হাতির পাল ফিরে যায় বনে, আবার কখনো ঘটে প্রাণঘাতী ঘটনা।শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় একসময় ছিল বন্য হাতির অবাধ বিচরণক্ষেত্র। কিন্তু বন-জঙ্গল কমে যাওয়া এবং মানুষের বসতি বাড়ার কারণে হাতির চলাচলের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়েছে। খাবার ও পানির সন্ধানে তাই প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে হাতির পাল।স্থানীয়দের অভিযোগ, হাতিরা রাতে ধান, ভুট্টা, কলা, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে। অনেক সময় বসতবাড়িতেও হানা দেয়। হাতি তাড়াতে গিয়ে প্রাণ হারান মানুষ, আবার মানুষের প্রতিরোধে মারা যায় হাতিও।
১১ বছরে ৩৯ হাতি ও ৩৬ মানুষের মৃত্যু
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শেরপুর জেলায় মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বে অন্তত ৪৭টি হাতি এবং ৬৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।এর মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে গত ১১ বছরে মারা গেছে ৩৯টি হাতি ও ৩৬ জন মানুষ। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও হাতির এই দ্বন্দ্ব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গারো পাহাড়ে বন্য হাতির বিচরণ রয়েছে।১৯৯৫ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পিক পাহাড় থেকে ২০ থেকে ২৫টি দলছুট বন্য হাতি এ অঞ্চলে চলে আসে। পরে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধার কারণে হাতিগুলো আর ফিরে যেতে পারেনি।নালিতাবাড়ীর কালাপানি এলাকার কৃষক বিজয় কুবি বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে হাতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন তিনি। প্রতি বছর কষ্ট করে ফলানো ফসল হাতির দল নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় বাড়িঘরেও তাণ্ডব চালায়।
নানা উদ্যোগেও মিলছে না স্থায়ী সমাধান
মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ২০১৪ সালে সীমান্ত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণ করা হয়।এরপর ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচি ও কর্নঝুড়া এলাকায় হাতির খাবারের জন্য ১০০ হেক্টর বনভূমিতে বিশেষ বাগান করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় লেবু ও বেতকাঁটার বাগানও গড়ে তোলা হয়।হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য সীমান্ত এলাকায় ১৬টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে হাতি তাড়ানোর জন্য আলো, টর্চ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রও বিতরণ করা হয়েছে।তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব উদ্যোগেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। পাহাড়ে খাবারের সংকট থাকায় হাতিরা বারবার লোকালয়ে চলে আসছে।
হাতি ঠেকাতে বসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র
মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত কমাতে সম্প্রতি নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। হাতির চলাচল শনাক্ত করে স্থানীয়দের আগাম সতর্ক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে নালিতাবাড়ীর হাতি উপদ্রুত এলাকায় ১৫টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর আগাম শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানো হবে।এসব যন্ত্রের মাধ্যমে হাতির গতিবিধি শনাক্ত করে দ্রুত স্থানীয়দের সতর্ক করা সম্ভব হবে। এতে জানমালের ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া হাতিকে লোকালয়ে আসা থেকে বিরত রাখতে বনের ভেতর খাবার ও পানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। হাতির বিচরণক্ষেত্রে জলাধার তৈরি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে গভীর পাম্প বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, গারো পাহাড়ের প্রায় ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় শতাধিক হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতির পাশাপাশি মানুষকেও রক্ষা করতে হবে। এ জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।তিনি বলেন, হাতিকে কোনো অবস্থাতেই বিরক্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে বন বিভাগ ও হাতি মোকাবিলা দলের মাধ্যমে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, গারো পাহাড়ে বন উজাড় ও মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে তাদের খাবারের উৎস। বেঁচে থাকার তাগিদেই তাই হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।গারো পাহাড়, বন্য প্রাণী ও নদী রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা বিপ্লব দে কেটু বলেন, হাতি প্রকৃতির পাহারাদার। আমরা চাই হাতি ও মানুষের মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান তৈরি হোক।বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খানের মতে, মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা জরুরি। গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থলের ধারণক্ষমতা ও বর্তমান হাতির সংখ্যা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে হাতির জন্য হুমকি
বিশ্বজুড়ে এশীয় ও আফ্রিকান হাতি নানা হুমকির মুখে রয়েছে। হাতির দাঁতের জন্য চোরাশিকার, বন ও আবাসস্থল ধ্বংস এবং পর্যটন ও বিনোদনের নামে হাতির ওপর নির্যাতন তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।বিশাল দেহের হলেও হাতির সবচেয়ে বড় হুমকি মানুষের কর্মকাণ্ড। তাই বিশ্ব হাতি দিবসে হাতি রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২৮ সফর ১৪৪৭