প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম (ভিজিট : )
ঢাকার কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, বড় বিপদের পূর্বাভাস?
তাজাখবর২৪.কম,মহানগর ডেস্ক: সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পর পর কয়েকটি ভূকম্প অনুভূত হয়। দেখা গেছে এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার খুব কাছেই। গত সোমবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ৪ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ। যা ঢাকার আগারগাঁও থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। তার আগের কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল গাজীপুর ও নরসিংদী। ঢাকার এত কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২শে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় যতগুলো ভূমিকম্প হয়েছে, এর মাঝে বেশ কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৪২ কিলোমিটার।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। যার উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল মাত্র ১৩ কিলোমিটার, যা দেশে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। ওই ভূমিকম্পে ঢাকায় চারজন, নরসিংদীতে পাঁচ জন এবং নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হন। আহন হন সাড়ে চার শতাধিক মানুষ। মাধবদীর ভূমিকম্পের পরদিন, ২২ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে ৩.৩ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে যার দূরত্ব ২৯ কিলোমিটার। একইদিনে ঢাকার বাড্ডায় ৩.৭ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়।এ বিষয়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর বলেন, বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয়ের নিচে ইউরেশিয়ান প্লেটের ওপর ইন্ডিয়ান প্লেট চাপ তৈরি করছে। এ কারণেই ওই অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। এর বাইরে তুলনামূলকভাবে ছোট বার্মা প্লেট বাংলাদেশের ভূখন্ডে চাপ তৈরি করছে। এ কারণেই মূলত এখানে ছোটখাটো ভূমিকম্প হচ্ছে।
ঢাকার আশপাশে একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এগুলো কি রাজধানীতে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার আশপাশের এসব ভূমিকম্প নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই।তিনি বলেন, ঢাকায় সেভাবে কোনো ফল্ট লাইন নেই। ঢাকার আশপাশে যেগুলো হচ্ছে, সেগুলো মূলত স্থানীয় ফল্ট লাইনের কারণে হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে এখানে বড় ভূমিকম্প হওয়ার রেকর্ড নেই। তাই আমরা এখনই বলতে পারি না যে এটি সামনে আমাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
তবে ঢাকার আশপাশে বড় ফল্ট লাইন না থাকলেও দেশের অন্যান্য প্রান্ত বা প্রতিবেশী দেশগুলোর ফল্ট লাইন থেকে বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান মেহেদি আহমেদ আনসারী।তিনি জানান, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ঐতিহাসিকভাবে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলো। তার মতে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি রয়েছে শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল এবং ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুর এলাকায় সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, প্রত্যেকটি ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড আছে। ঢাকা থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বড় ভূমিকম্প হয়েছিলো। যার রিটার্ন পিরিয়ড বড় হবে প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর। সেটা হয়তো ২২৫০ সালের আশেপাশে হবে। আর ৭ মাত্রার গুলোর রিটার্ন পিরিয়ড হবে দেড়শো-দুইশো বছরের মাঝে। সেজন্যই আমরা বলি ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকায় শিগগিরই আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এটা কবে হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ২০ বছরও লেগে যেতে পারে।
২০০৯ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমপি) এর যৌথ জরিপে বলা হয়েছিল, ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১৫ লাখই ছোট বিল্ডিং বা টিনশেড, যা ভেঙে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির শঙ্কা কম। বাকি ৬ লাখ ভবন ছয়তলার ওপরে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এর মধ্যে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড না মানা, দুর্বল নির্মাণব্যবস্থা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ঢাকার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে উন্নত করা দরকার।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ই আষাঢ় ১৪৩৩, ৯ মহারম, ১৪৪৭