সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে অ্যাম্বুলেন্স সেবা, জিম্মি রোগী ও স্বজনরা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম  (ভিজিট : )
সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে অ্যাম্বুলেন্স সেবা, জিম্মি রোগী ও স্বজনরা

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে অ্যাম্বুলেন্স সেবা, জিম্মি রোগী ও স্বজনরা

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে প্রয়োজন অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত এই সেবাতেই চলছে নানা অনিয়ম ও নৈরাজ্য। নেই নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট, কার্যকর নিয়ন্ত্রণও নেই। রোগীর স্বজনদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যে যার মতো ভাড়া আদায় করছেন। এর সঙ্গে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস নিয়েও নানা জটিলতা। সব মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে জরুরি এই সেবা।ভাড়ার নৈরাজ্য, সিন্ডিকেটের দাপট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে ধুঁকছে দেশের অ্যাম্বুলেন্স সেবা। এতে বিপাকে পড়ছেন চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা।ব্যাংকার আশিকুর রহমান অসুস্থ মাকে নিয়ে ফিরতে চান নিজ জেলা পাবনায়। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র মিললেও বাড়ি ফেরার পথটুকুই যেন তার কাছে আরেক যুদ্ধ। অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন তিনি। রোগী পরিবহনের আগেই শুরু হয় দর-কষাকষি। চালকরা যে যার মতো চড়া ভাড়া হাঁকান।আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমার মা হাসপাতালে আছেন। প্রায় আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ঘোরাফেরা করেছি, একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা যায় কি না। চার-পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু একেকজন একেক রকম ভাড়া চাইছেন। কেউ ১১ হাজার, কেউ ১২ হাজার, কেউ ৯ হাজার, আবার কেউ ১০ হাজার টাকা চাচ্ছেন।’

অন্তঃসত্ত্বা এক স্বজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন আব্দুর রহমান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ওই স্বজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুঁজেও মেলেনি লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান। যারা যেতে রাজি হয়েছেন, তারাও চেয়েছেন অস্বাভাবিক ভাড়া।আব্দুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পাই নি। বাইরে থেকে ফ্রিজিং সুবিধাসহ একটি অ্যাম্বুলেন্স আনার চেষ্টা করেছি; আনতে পারিনি। মৃত স্বজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, তার সন্তান প্রসবের কথা ছিল; তবে এর আগেই তিনি মারা যান।’অসুস্থ রোগী, মৃত্যুপথযাত্রী কিংবা প্রিয়জনের নিথর দেহ নিয়ে এমন বিপাকে পড়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহৃত এই যানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চলছে বাড়তি ভাড়া আদায়। অথচ ভাড়া নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না অনেক মালিক ও চালক।

নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে মহানগর এলাকায় প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া ১০০ টাকা। আর আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য যোগ হবে ১৫০ টাকা।একইভাবে মরদেহ বহনকারী ফ্রিজার ভ্যানের সেবামূল্যও নির্ধারিত রয়েছে। তবে এসব নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না অনেক অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালক। প্রশ্ন উঠছে, এই নৈরাজ্যের পেছনে কারা?চালকদের ভাষ্য, অ্যাম্বুলেন্স চলাচল নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিভিন্ন স্ট্যান্ড ও মালিক সমিতির প্রভাব। এক স্ট্যান্ডের গাড়ি অন্য এলাকায় গিয়ে রোগী পরিবহন করতে গেলেও বাধার মুখে পড়তে হয়। এক চালক বলেন, ‘একেকজনের একেকটা স্ট্যান্ড। তাদের স্ট্যান্ডের তাদের ক্ষমতা, আমাদের স্ট্যান্ডের আমাদের ক্ষমতা। আমি হুট করে গিয়ে কাউকে কিছু না বলে রোগী নিয়ে চলে যেতে পারি না। আগে জানাতে হয়, আমার সঙ্গে একটি পার্টি কথা বলেছে, আমি রোগী নিতে আসছি।’

আরেক চালক বলেন, ‘আমরা রোগী নিতে পারি, তবে তাদের খরচ দিতে হবে। স্ট্যান্ডের জায়গার খরচ দিতে হয়। স্ট্যান্ড খরচ ৩ হাজার টাকা। সেখানে মালিক সমিতি আছে, হাসপাতালের সামনে তাদের গাড়ি থাকে। সেখান থেকেই গাড়ি নিতে হয়। এটাই সিন্ডিকেট। সেখান থেকে গাড়ি নিলে ভাড়া ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়।’অদৃশ্য সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে জিম্মি অ্যাম্বুলেন্স সেবা। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় রোগী নিয়ে গেলেও দিতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। একেক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে একেকটি চক্র। এই কারসাজিতে সাধারণ চালকরাও জিম্মি। এমন পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইছে।

বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাদবর বলেন, ‘আগেও আমরা নীতিমালার দাবিতে আন্দোলন করেছি। কোনো কিছুর নীতিমালা থাকলে সেটি সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। সরকার যদি আমাদের জন্য নীতিমালা করে দেয়, তাহলে সেখানে ভাড়ার চার্টসহ গাড়ি কীভাবে চলবে, তার সবকিছু নির্ধারিত থাকবে। এতে সমস্যাগুলো দূর হবে। আমরা দ্রুত এই নীতিমালা বাস্তবায়ন চাই।’শুধু ভাড়ার নৈরাজ্যই নয়, অ্যাম্বুলেন্সে শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, অক্সিজেন সিলিন্ডার, সাইরেন, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক মালিক তা মানছেন না। সাধারণ মাইক্রোবাসকে রূপান্তর করেই তৈরি করা হচ্ছে অনেক অ্যাম্বুলেন্স। এসব গাড়ির বেশির ভাগেই নেই শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর শোয়ার জায়গাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে রোগীর পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও।তবে অ্যাম্বুলেন্স সেবার এই বিশৃঙ্খলার জন্য শুধু বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করছেন না বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘদিন ধরে এই সেবায় কার্যকর সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের অভাবকেই মূল সমস্যা হিসেবে দেখছেন তারা।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ড. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ খুব বেশি চিন্তাভাবনা করে না, অথচ এটি অত্যন্ত জরুরি। আমরা শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক ও নার্স নিয়ে ভাবব, কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সকে গুরুত্ব দেব না-তা হতে পারে না। স্বাস্থ্য বিভাগ যদি অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে পরিকল্পনা করে, তাহলে ভাড়ার হার নির্ধারণ করা কঠিন কোনো কাজ নয়। তারা উদ্যোগ নিলেই এটি সম্ভব।’স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘যারা অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা করছেন, তাদের একটি ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সারা দেশে অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারবে না। তাই বেসরকারি সেবাদাতাদের কীভাবে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যায়, সে ধরনের ব্যবস্থা করতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগে এমন ব্যবস্থা শুরুও হয়েছিল, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত এগোতে পারেনি।’

দেশজুড়ে ডিজিটাল অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, ‘সরকারের ইচ্ছা, অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা। সারা দেশে একটি অ্যাম্বুলেন্স পুল তৈরি করতে চাই, যা অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিটি জেলায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা গড়ে তুলতে চাই।’জরুরি মুহূর্তকে পুঁজি করে চলা এই নৈরাজ্য থেকে স্থায়ী পরিত্রাণ চান ভুক্তভোগীরা। অন্যদিকে কর্মঘণ্টা নির্ধারিত না থাকা, পার্কিংয়ের অসুবিধাসহ নানা সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথাও বলছেন মালিক ও চালকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করা সম্ভব।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩, ২৩ জমাদিউল আউয়াল  ১৪৪৮

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝