তাজাখবর২৪.কম,কুমিল্লা: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ কুমিল্লা। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।পুলিশের দাবি, সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
যেভাবে নিখোঁজ অপ্রতিম
শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি সে। রাত পর্যন্ত ছেলের সন্ধান না পেয়ে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। একই সঙ্গে ছেলে নিখোঁজের খবর জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম।পরে ‘মুন অ্যালার্ট’-এর মাধ্যমে অপ্রতিমের ছবি ও নিখোঁজের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরাও অপ্রতিমের সন্ধান চেয়ে ব্যাপকভাবে পোস্ট দিতে থাকেন।
শেষবার ফোনের অবস্থান
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ফোনটির অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা যায়। এরপর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।এদিকে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে সাইফুল ইসলাম তুহিন নামে এক তরুণকে দেখা যায়।
জঙ্গল থেকে উদ্ধার মরদেহ
শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন।পরে কাছে গিয়ে তারা শিশুটির মাথার দিকে রক্ত দেখতে পান। ভয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। পরে স্থানীয় মামুন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ থাকার খবর জানতে পারেন জিলানী। এরপর তিনি মামুনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ঘটনাস্থলে যান এবং পড়ে থাকা শিশুটিই অপ্রতিম বলে শনাক্ত করেন। বেলা একটার দিকে ঘটনাস্থল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজে তুহিন, এরপর একে একে আটক
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রথমে সাইফুল ইসলাম তুহিনকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়।পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুই কিশোর এবং মো. সিয়াম নামে এক কলেজছাত্রকে হেফাজতে নেওয়া হয়।আটক ব্যক্তিরা হলেন, সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), কামরুল হাসান (১৫), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৬) ও মো. সিয়াম (১৯)।পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন ও অপর দুই কিশোরের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। সিয়ামের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।
পুলিশের ভাষ্যে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা
রোববার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।পুলিশের দাবি, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে শালবন এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন স্থানে তিনজন অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে এবং পরে সঙ্গে থাকা দুই কিশোর বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তুহিন অপ্রতিমের আইফোনটি নিয়ে যায় বলে পুলিশের দাবি।পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং আইফোনটি তুহিনের দেখানো মতে তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবারের প্রশ্ন আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে?
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় ছেলেকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বলেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে?এ সময় এমপি মনিরুল হক চৌধুরীও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একজন শিশুকে রক্ষা করতে না পারায় তিনি লজ্জিত ও দুঃখিত। এ ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার কথাও জানান তিনি।
জানাজা ও দাফন
রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সহপাঠী ও স্থানীয় লোকজন অংশ নেন।পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টার দিকে গন্ধমতিতে বাসার পাশের কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়।দ্বিতীয় জানাজার আগে ছেলে হারানোর বেদনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অপ্রতিম দুই বছর বয়স থেকে এই এলাকায় বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তাই তাদের কাছেই ছেলেকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।দাফনের পর তিনি বলেন, এখন তার একটাই দাবি সন্তান হত্যার উপযুক্ত বিচার।তিনি বলেন, সামান্য একটা আইফোনের জন্য আমার ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে এ কথা আমার মন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ
অপ্রতিম হত্যার বিচার ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম জানাজা শেষে মিছিল নিয়ে কোটবাড়ি বিশ্বরোডের নন্দনপুর এলাকায় যান তারা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহাসড়কের উভয়মুখী লেনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।তারা হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান এবং ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। পরে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক থেকে সরে যান। এ সময় মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।এ ছাড়া অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সংহতি জানান।
দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আশ্বাস
রোববার সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ে হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত উদ্ধারের জন্য পুলিশের প্রশংসা করতে হবে। অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।পুলিশও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।এখন পরিবারের দাবি, তদন্ত দ্রুত শেষ করে হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৯ রবউিস সানি ১৪৪৮