প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম (ভিজিট : )
ভারতে পুতিনের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি।
তাজাখবর২৪.কম,আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে ভারতে এসেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রোববার সম্মেলন শেষ করে দেশের ফেরার কথা রয়েছে বিশ্বের ক্ষমতাধর এই নেতার। এ সময় নিয়ে নিজের মল-মূত্র সঙ্গেও নিয়ে যাবেন তিনি।বিষয়টি অবাক করার মতো হলেও পুতিনের নিরাপত্তার জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ‘দ্য এক্সপ্রেস ইউএস’।গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, পুতিনের স্বাস্থ্য সম্পর্কে যাতে কোনও তথ্য কারও হাতে না যায়, সে কারণেই বিদেশসফরের সময় রুশ প্রেসিডেন্টের মলমূত্র সংগ্রহ করে মস্কোয় ফেরত নিয়ে আসেন তার দেহরক্ষীরা। পুতিনের মল-সহ সমস্ত মানববর্জ্য সংগ্রহ করেন একটি প্যুপ স্যুটকেসে।
এ ছাড়াও, পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে ‘চেগেট’ নামে পরিচিত রাশিয়ার পারমাণবিক কমান্ড ব্রিফকেসের কথাও প্রায়ই উঠে আসে। এই ব্যবস্থা রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ।এটি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে রাখা হয় এবং প্রয়োজন হলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পুতিন ক্রমাগত তার নিরাপত্তা বাড়িয়ে চলেছেন। পুতিনের আশপাশে কর্মরত কর্মীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অনুমতি নেই। তাদের অবশ্যই মাস্ক পরতে হয়। পুতিনের সঙ্গে দেখা করার আগে হাতঘড়িও খুলে রাখতে হয়।এ ছাড়াও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেখানেই যান, সঙ্গে পৌঁছে যায় নজিরবিহীন নিরাপত্তার এক বিশাল আয়োজন। নিরাপত্তা বেষ্টনীর নজর এড়িয়ে মাছি গলারও সাধ্য নেই।
মূলত, পুতিনের গতিবিধি ও শারীরিক অবস্থার ন্যূনতম কোনও তথ্য যাতে বিদেশি শক্তির নাগালে না আসতে পারে তার জন্য সদাজাগ্রত প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরা। ভারতেও তার অন্যথা হওয়ার জো নেই।রাশিয়া অনুসন্ধানকারী সংবাদসংস্থা ডসিয়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশেষ বাহিনী রয়েছে, যার নাম রাশিয়ান প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিস বা এসবিপি।এই সংস্থাটি রাশিয়ার ফেডারেল প্রোটেক্টিভ সার্ভিস বা এফএসও-এর অধীনে কাজ করে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার শিকড় সোভিয়েত আমলের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি-র সঙ্গে যুক্ত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পুতিন নিজেও একসময় কেজিবি-র এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন।এই এফএসও-তে প্রায় ৫০,০০০ কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন। এই সংখ্যাটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সুরক্ষা প্রদানকারী সিক্রেট সার্ভিস কর্মীদের সংখ্যার চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি। পুতিন সব সময় ৩০ জন সশস্ত্র রক্ষী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন। এ ছাড়া তাঁকে ঘিরে থাকা শত শত মানুষের মধ্যে এফএসও এজেন্টরা মিশে থাকেন।
পুতিনের সফরকালে শ্যেনদৃষ্টিতে নজর রাখেন তারা। কালো সুট ও ইয়ারফোন গোঁজা এসবিপি রক্ষীরা ছায়ার মতো দিন-রাত পুতিনকে অনুসরণ করেন। ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুসারে, পুতিন যখন অন্য রাষ্ট্রে সফর করেন, তখন তার নিরাপত্তা চারটি স্তরে বিভক্ত থাকে।পুতিনের নিরাপত্তা বলয়ের প্রথম স্তরে থাকেন পুতিনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। কালো পোশাক পরে, ইয়ারফোন কানে গুজে প্রেসিডেন্টের খুব কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেন তারা। দ্বিতীয় স্তরে যাঁরা নিয়োজিত থাকেন তাঁরাই সবচেয়ে ধুরন্ধর। এদের চলাফেরা ও কাজকর্ম অত্যন্ত গোপনীয়। এমন গুপ্তচরদের নিয়ে গঠিত যারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকেন।তৃতীয় স্তরটি বহিরাগতদের পুতিনের কাছে আসতে বাধা দেয়। নিরাপত্তাকর্মীরা পুরো এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে এবং যে কোনও অপরিচিত ব্যক্তিকে দূরে রাখে। বলয়ের চতুর্থ স্তরটি সবচেয়ে বাইরের এবং সবচেয়ে মারাত্মক স্তর। এটি স্নাইপারদের নিয়ে গঠিত, যারা কাছাকাছি উঁচু ভবনগুলোর ছাদে অবস্থান করেন। দূর থেকে আসা কোনও হুমকি বা বিপদকে নির্মূল করেন চোখের পলকে।
পুতিনের ভারতসফরকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। ভারত এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সমন্বয় করে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। পুতিনের বিমান দিল্লিতে অবতরণের পর থেকেই এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয়।নিরাপত্তার সবচেয়ে ভিতরের স্তরে থাকেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিস বা এসবিপি-র সদস্যেরা। তারা সব সময় পুতিনের সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁকে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে এদেরই কাঁধে।এর পরের স্তরে রয়েছেন ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা এনএসজি-র কমান্ডোরা। সন্ত্রাসবাদী হামলা বা কোনও বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই কমান্ডোরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিরাপত্তার বাইরের স্তর সামলাচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
পুতিনের যাতায়াতের রাস্তা, আশপাশের এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিরও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ ড্রোন, জ্যামার, এআই-ভিত্তিক নজরদারি এবং মুখমণ্ডল শনাক্ত করার প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। পুতিনের গাড়িবহরের যাত্রাপথে থাকা উঁচু ভবনগুলোতেও স্নাইপার দল মোতায়েন করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুতিনের স্থল নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হল তার গাড়ি যা ‘চলন্ত বাঙ্কার’ নামেই অধিক পরিচিত। এটি একটি বুলেট ও বোমা নিরোধক অরাস সেনাট মডেলের লিমুজ়িন। রুশ প্রেসিডেন্টকে সড়কপথে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এটি বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে রয়েছে জরুরি অক্সিজেন, রান-ফ্ল্যাট টায়ার, একটি সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পালানোর একাধিক পথ। এর বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা রাসায়নিক ও জৈবিক আক্রমণ থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে। টায়ার বা জানলা ভেঙে গেলেও এটির ইঞ্জিন থেমে যায় না।
ডসিয়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পুতিন সাধারণত একটি ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ বিমানে ভ্রমণ করেন, যেটিকে রুশ গণমাধ্যম ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ নাম দিয়েছে। এই বিমানটি ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এনক্রিপ্টেড কনফারেন্স রুম এবং একটি কমান্ড সিস্টেম দিয়ে সজ্জিত। এমনকি পারমাণবিক হামলার নির্দেশও দিতে পারে সেটি। তবে পুতিন কখনওই একটি মাত্র বিমানে ভ্রমণ করেন না। বরং, একই রুটে অন্তত একটি বা দু’টি সহায়ক বিমান থাকে, যাতে তিনি কোন বিমানে আছেন তা শত্রুপক্ষের হদিস পাওয়া সম্ভব না হয়।এ ছাড়াও পুতিনের নিরাপত্তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি হল তার খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নিরাপত্তা। পুতিনের খাবার কখনওই সফররত দেশের হোটেলের রান্নাঘরে তৈরি করা হয় না। রুশ সর্বাধিনায়কের সঙ্গে থাকা রুশ রাঁধুনিরা সমস্ত অন্ন-ব্যঞ্জন প্রস্তুত করেন।
রান্না করার সময় তাদের প্রত্যেককেই দস্তানা পরতে হয়। দিনে বেশ কয়েক বার পোশাকও বদলাতে হয়। হাতে কোনও ক্ষত আছে কি না তা বার বার পরীক্ষা করাতে হয়। পুতিনের মেনুর প্রতিটি উপাদান পরীক্ষা করা হয় এবং খাবার পুতিনের কাছে পৌঁছোনোর আগে সেগুলি তার দেহরক্ষীরা চেখে দেখেন যাতে খাবারে বিষ থাকলে তার প্রভাব প্রথমে তাদের উপরেই পড়ে।পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও একটি চর্চিত দিক হল তার মলমূত্র সংরক্ষণের বিষয়টি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ প্রেসিডেন্ট যেখানেই যান, তার মলমূত্র সংগ্রহের জন্য দেহরক্ষীরা ওই স্যুটকেস সঙ্গে করে নিয়ে যান। পুতিনের মলমূত্র সংগ্রহ করে আবার তা রাশিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮