বন বিড়াল প্রকৃতির এক অজানা সহযোদ্ধা
প্রকাশ: রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৫ পিএম  (ভিজিট : )
বন বিড়াল প্রকৃতির এক অজানা সহযোদ্ধা

বন বিড়াল প্রকৃতির এক অজানা সহযোদ্ধা

কাজী মোস্তাফিজ,তাজাখবর২৪.কম, যশোর: বাংলার নিভৃত জলাভূমি, ঘন ঝোঁপঝাড় কিংবা পরিত্যক্ত পুরোনো ভবনে নীরবে বসবাস করে এক চতুর শিকারি জাঙ্গল ক্যাট, যা আমাদের কাছে বন বিড়াল, জংলি বিড়াল বা খাগড়া বিড়াল নামেই বেশি পরিচিত। মানুষের চোখের আড়ালে থাকলেও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।অভিযোজন আর বেঁচে থাকার লড়াই বন বিড়াল অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার অধিকারী। গাছে ওঠা, সাঁতার কাটা কিংবা দ্রুত দৌড়ানো সব ক্ষেত্রেই এরা পারদর্শী। নিশাচর হওয়ায় দিনের আলোয় খুব কমই দেখা মেলে এদের। রাত নামলেই শুরু হয় খাদ্য অনুসন্ধান, আর সেই খোঁজে এক রাতে ৩ থেকে ৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করাও এদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। বাংলাদেশের হাওর-বাঁওড়, নদী-তীরবর্তী এলাকা এবং ধানক্ষেত ঘেঁষা ঝোঁপঝাড়ে এদের উপস্থিতি বেশি। পরিবেশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকতে পারে যে, অনেক সময় কাছাকাছি থাকলেও মানুষ টের পায় না।

কৃষকের নীরব বন্ধু বন বিড়ালের খাদ্যতালিকায় আছে পাখি, খরগোশ, গিরগিটি, মাছ, ব্যাঙ, এমনকি সাপও। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এরা বিপুল পরিমাণ ইঁদুর ও ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে থাকে। এই ইঁদুরই ধান ও অন্যান্য ফসলের বড় শত্রু। ফলে বন বিড়াল কৃষকের অজান্তেই ফসল রক্ষা করে। এক অর্থে বলা যায়, রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিকভাবেই কাজ করছে প্রাণীটি। যদিও মাঝে মাঝে খাবারের অভাবে গ্রামাঞ্চলের হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়ে হানা দেয় কিন্তু সেই ক্ষতি সামগ্রিক উপকারের তুলনায় খুবই সামান্য।মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মানুষের সঙ্গে বন বিড়ালের সম্পর্ক সব সময় ইতিবাচক নয়। অনেক সময় মানুষ এটিকে ক্ষতিকর ভেবে হত্যা করে। আবার গ্রামাঞ্চলে ‘বাঘের বাচ্চা’ বা ‘বিপজ্জনক প্রাণী’ বলে ভুল ধারণাও আছে। এই ভুল বোঝাবুঝির কারণেই অনেক বন বিড়াল অকারণে প্রাণ হারাচ্ছে। অথচ বাস্তবে এরা মানুষের জন্য হুমকি নয়।হুমকির মুখে আবাসস্থল বর্তমানে বন বিড়ালের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আবাসস্থল হারানো। জলাভূমি ভরাট, বন উজাড়, কৃষিজমির পরিবর্তন এসব কারণে এদের বসবাসের জায়গা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার বন বিড়ালকে ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও স্থানীয়ভাবে অনেক জায়গায় এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

আইন ও সংরক্ষণ উদ্যোগ
বাংলাদেশে ওয়াইল্ডলাইফ (কনজারভেশন অ্যান্ড সিকিউরিটি) অ্যাক্ট অনুযায়ী বন বিড়াল সংরক্ষিত প্রাণী। এ আইনের আওতায় এই প্রাণী হত্যা, শিকার বা ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে শুধু আইন করলেই যথেষ্ট নয় প্রয়োজন বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা। প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীরই নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। বন বিড়াল খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে এটি ফসল রক্ষা করে এবং একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। এদের সংখ্যা কমে গেলে ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে যা সরাসরি মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলবে।

সচেতনতা প্রয়োজন প্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে, বন বিড়াল রক্ষায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। এজন্য দরকার গ্রামাঞ্চলে প্রচারণা চালানো, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা ও স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা। এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে বন বিড়ালসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারবে।নিঃশব্দে, নিভৃতে নিজের কাজ করে যায় বন বিড়াল। মানুষের উপকার করেও বিনিময়ে পায় অবহেলা, কখনো নির্মমতা। প্রকৃতির এই অজানা সহযোদ্ধাকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়-বরং আমাদের নিজেদের পরিবেশ, কৃষি ও ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা। প্রকৃতি আর প্রাণের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে বন বিড়াল বেঁচে থাকুক- এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝