প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম (ভিজিট : )
মঞ্চ একই, সময় আলাদা: জাতিসংঘে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে এবার আলোচনায় বাংলাদেশের জিয়া পরিবার। এই পরিবারের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন, তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একই মঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন। এবার তাদের ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন।তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেবেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে তার প্রথম ভাষণ।
বিশ্বমঞ্চে একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা বিরল হলেও একেবারে নজিরবিহীন নয়। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আমেরিকার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবারে এমন উদাহরণ রয়েছে।জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতেও ওই ভাষণের রেকর্ড রয়েছে। সেখানে তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একাধিকবার ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালের অধিবেশনের সরকারি নথিতে তার বক্তব্যের রেকর্ড রয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। পরে তার মেয়ে শেখ হাসিনাও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার জাতিসংঘের একই মঞ্চে ভাষণ দিয়েছেন।যুক্তরাষ্ট্রের বুশ পরিবারেও বাবা ও ছেলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছেন। জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪১তম প্রেসিডেন্ট। তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে একাধিকবার জাতিসংঘে বক্তব্য দেন। তার ছেলে জর্জ ডব্লিউ বুশ ছিলেন দেশটির ৪৩তম প্রেসিডেন্ট এবং ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে প্রতি বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন।শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে পরিবারেও রয়েছে একই ধরনের নজির। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েকে ১৯৫৬ সালে জাতিসংঘে ভাষণ দেন। তার স্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একাধিকবার বক্তব্য রাখেন। পরে তাদের মেয়ে চন্দ্রিকা বন্দরনায়েকে কুমারাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দেন।
পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবারেও বাবা ও মেয়ের এমন নজির রয়েছে। জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি—দুই পরিচয়েই ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে জাতিসংঘে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার মেয়ে বেনজীর ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৯ ও ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন।ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন পরিবারেও একই ধরনের উদাহরণ রয়েছে। দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট আহমদ সুকর্ন ১৯৬০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৫তম অধিবেশনে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো তার ওই ভাষণকে বিশ্বস্মৃতি কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে। পরে তার মেয়ে মেঘবতী সুকর্নপুত্রি ইন্দোনেশিয়ার পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন।
ইন্দোনেশিয়ার জোযোহাদিকুসুমো পরিবারেও রয়েছে এমন নজির। অধ্যাপক সুমিত্রো জোযোহাদিকুসুমো দেশটির স্বাধীনতার শুরুর দিকে জাতিসংঘে ইন্দোনেশিয়ার কূটনৈতিক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। পরে তার ছেলে প্রাবোও সুবিয়ান্তো ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবার ভাষণ দেন।থাইল্যান্ডের শিনাওয়াত্রা পরিবারেও ভাই-বোনের জাতিসংঘের মঞ্চে উপস্থিতির নজির রয়েছে। থাকসিন শিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকে থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার বোন ইংলাক শিনাওয়াত্রাও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন।
মালয়েশিয়ার রাজাক পরিবারেও বাবা ও ছেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছেন। তুন আবদুল রাজাক ছিলেন দেশটির দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। তার ছেলে নাজিব রাজাক ছিলেন ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। মালয়েশিয়ার সরকারি নথিতে নাজিবের ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালের সাধারণ পরিষদের ভাষণের রেকর্ড রয়েছেমধ্যপ্রাচ্যেও এমন রাজনৈতিক পরিবারের নজির রয়েছে। জর্ডানের হাশেমি রাজপরিবারের বাদশাহ হুসেইন বিন তালাল এবং তার ছেলে বর্তমান বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ—দুজনই জাতিসংঘের মঞ্চে জর্ডানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।কাতারের আল থানি পরিবারেও বাবা ও ছেলে আমির হিসেবে জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছেন। সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি এবং বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি—দুজনই বিশ্বমঞ্চে কাতারের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
সিরিয়ার আসাদ পরিবারেও বাবা ও ছেলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের নজির রয়েছে। হাফেজ আল-আসাদ ও তার ছেলে বাশার আল-আসাদ—দুজনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেছেন।ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবারেও তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার জাতিসংঘের মঞ্চে দেখা গেছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮ ও ১৯৬০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৬৮ ও ১৯৮৫ সালে বক্তব্য রাখেন। পরে ইন্দিরার ছেলে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৫ ও ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
আফ্রিকাতেও এমন কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবারের উদাহরণ রয়েছে। গ্যাবনের বংগো পরিবার, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কাবিলা পরিবার এবং টোগোর নাসিংবে পরিবারে বাবা ও ছেলে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের মঞ্চে একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মের উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিতে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে এমন পরিবারের উদাহরণও রয়েছে। এবার জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে তারেক রহমানের জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি সেই তালিকায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করছে।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ১২ রবউিস সানি ১৪৪৮