গুমের শিকার গণঅধিকার পরিষদ নেতা দিলেন নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১:১৭ পিএম  (ভিজিট : )
গুমের শিকার গণঅধিকার পরিষদ নেতা দিলেন নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা

গুমের শিকার গণঅধিকার পরিষদ নেতা দিলেন নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: গুমের মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসা একজন মানুষই কেবল অনুভব করতে পারেন সেই সময়টিতে কতটা নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।নিখোঁজ বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম দিবসে নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের একাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তুলে ধরেছেন তেমনই ভুক্তভোগী শাকিল উজ্জামান। তিনি গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও উচ্চতর পরিষদের সদস্য।গুমের শিকার হওয়ার পাঁচ বছর পার হলেও সেই সময় তাকে ঠিক কোথায় আটকে রাখা হয়েছিল, তা আজও তার অজানা।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামনে পৌঁছালে তিন ব্যক্তি তার কাছে এসে পরিচয় জানতে না দিয়ে মোবাইল দেখতে চান। তিনি তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দিলে মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় র‍্যাব (RAB) লেখা পোশাক পরিহিত কয়েক গাড়ি সদস্য এসে তাকে ঘিরে ফেলে এবং একটি কালো গাড়িতে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।গাড়িতে তোলার পরপরই শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। দুই পাশ ও পিছনের সিটে থাকা সদস্যরা তার নাক, মুখ, মাথা ও পিঠে বেপরোয়াভাবে আঘাত করতে থাকেন। বুটের আঘাতে তার পায়ের আঙুল থেঁতলে রক্ত বের হতে শুরু করে। চলন্ত গাড়িতে নির্যাতন চালাতে চালাতেই তাকে একটি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওষুধ খাওয়ানোর পর হাতে হাতকড়া, চোখে গামছা এবং মাথায় একটি কালো ফাঁসির যমটুপি পরিয়ে দেওয়া হয়। অস্ত্রের শব্দ এবং চারপাশের পরিস্থিতি তাকে জানান দিচ্ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পরিবেশের কথা।

পরবর্তীতে সেখান থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ভবনের রুমে, যেখানে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে হুমকি দেন। ওই কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দেন, তাকে তুলে আনার খবর কেউ জানে না এবং তাকে মেরে ফেললেও দু-একদিন মিছিল-মিটিং ছাড়া আর কিছুই হবে না। ফলে যেকোনো সময় বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ‘ক্রসফায়ার’-এর শিকার হওয়ার গভীর শঙ্কায় দিন কাটে তার।পরবর্তী সময়ে তাকে স্থানান্তরিত করা হয় একটি বদ্ধ রুমে, যা ‘টর্চার সেল’ বা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত। রাতে খাবার দেওয়া হলেও ঘুমানোর চরম কষ্টকর ব্যবস্থা ছিল—হাতকড়ার এক অংশ দেয়ালের গ্রিলের সঙ্গে উঁচুতে বেঁধে রাখা হতো, যার ফলে স্থির এক অবস্থাতেই যন্ত্রণাদায়কভাবে রাত কাটাতে হতো। ২৭ মার্চ দিনভর একইভাবে চোখ বাঁধা ও যমটুপি পরানো অবস্থায় গাড়িতে ঘুরিয়ে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, রাতে ঘুমাতে না দিয়ে নেওয়া হয় হাতের সিলছাপ।

নির্যাতনে শরীর ক্ষতবিক্ষত হওয়ায় এবং পা ও নাক দিয়ে অনবরত রক্ত পড়ায় অবশেষে ২৮ মার্চ ভোররাতে তাকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে পাঠানো হয় মতিঝিল থানায়। আদালত দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার পর পুনরায় আদালতে তোলা হলে তাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় কারাবাসের পর অবশেষে তিনি জামিনে মুক্তি পান।জীবিত ফিরে এসে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তার সন্ধানের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনরত সহযোদ্ধা, সঠিক তথ্য তুলে ধরা সাংবাদিক এবং আইনী লড়াই চালানো আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি মন্তব্য করেন, এই প্রতিবাদ ও সত্য প্রকাশের কারণেই হয়তো তাকে অতীতে গুম হওয়া অনেকের মতো প্রাণ দিতে হয়নি।

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও বিচারিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বদলে দেশকে অপরাধের সাম্রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনাকে আঘাত করা হয়েছে।অবশ্য এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। মানুষের অধিকার আদায় ও বিদেশী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে দৃঢ় থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি জানান, অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে দুটি ঈদ তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে, প্রয়োজনে আরও কাটাতেও প্রস্তুত।ইতিহাস তুলে ধরে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নির্যাতনের মুখে যারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে তারাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়। আগামী দিনে গণমানুষের অধিকার আদায়ে নতুন প্রজন্ম অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলেই তার বিশ্বাস।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা:সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ , ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝