তাজাখবর২৪.কম,আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির মালভিয়া নগরের ফ্লারিশ স্টে হোটেলে আগুনে মৃত ২২ জনের মধ্যে এক আফ্রিকান দম্পতিও রয়েছেন। হোটেলের একটি বাথরুম থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন।উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, স্ত্রী বাথরুমের টয়লেটের ওপর বসে ছিলেন, আর তার স্বামী কাছের একটি চেয়ারে। তারা দৃঢ়ভাবে একে অপরকে আলিঙ্গন করে ছিলেন, স্ত্রীর মাথা স্বামীর কাঁধে রাখা ছিল। ধোঁয়ার কারণে দমবন্ধ হয়ে উভয়ের মৃত্যু হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ওই দম্পতি দিল্লিতে এসেছিলেন কাছাকাছি একটি হাসপাতালে আইভিএফ চিকিৎসার জন্য। এটা এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে শরীরের বাইরে (ল্যাবরেটরিতে) ডিম্বাণু ও শুক্রাণু মিলিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। পরে সেই ভ্রূণ নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়, যাতে গর্ভধারণ হতে পারে।
শনাক্ত লাশের মধ্যে লাইবেরিয়ান নারী
৬১ বছর বয়সি লাইবেরিয়ান নাগরিক জেনজে এন. রোল্যান্ডের দেহ শনাক্ত করা হয়েছে। তিনিও আগুনে মারা গেছেন। তার স্বামী ইতোমধ্যে ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং বেঁচে গেছেন। এক আত্মীয় এয়ারএমএস মর্গে এসে তার দেহ শনাক্ত করেন।
হোটেল মালিকের কথা: ‘দিল্লিতে সব চলে’
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বুধবার রাতেই প্রধান অভিযুক্ত ও হোটেল মালিক লভকেশ বাজাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আদালত চার দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে।জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা জানতে চেয়েছিলেন, মাত্র ছয়টি রুমের লাইসেন্স ও ফায়ার এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) না থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে ২৫টি রুম চালাচ্ছিলেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাজাজ উত্তর দিয়েছেন, ‘দিল্লিতে সব চলে।’পুলিশ জানিয়েছে, তিনজন অংশীদার মিলে হোটেলটি চালাচ্ছিলেন। তারা দিল্লিতে একাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউসের মালিক। পর্যটন দফতরের লাইসেন্স ছিল জয় মিশ্রের নামে।
অগ্নিকাণ্ড দেখে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যান মালিক
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে বাজাজ বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, হোটেলে আগুন লাগার সময় তিনি গাড়ি করে তার পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু কাউকে সাহায্য করার জন্য থামেননি। পুলিশকে তিনি জানিয়েছেন, তিনি ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সারাদিন শহরের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন।
আগুন নিচতলায় লেগে পালানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়
দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের চিফ ফায়ার অফিসার এ.কে. মালিক জানান, ভবনটির একটি গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং ওপরে পাঁচতলা। শুধুমাত্র একটি সিঁড়ি দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা ছিল।ভবনের সব জানালা সিল করা ছিল, ফলে আটকে পড়াদের পালানোর সুযোগ ছিল খুবই কম। আগুন প্রথমে নিচতলায় লাগে এবং দ্রুত ভবনের একমাত্র পালানোর রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ধোঁয়া দ্রুত ওপরতলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেক অতিথি বের হতে পারেননি।
দুর্ঘটনার পাঁচটি প্রধান কারণ
১. জানালাগুলো সিল করা ছিল, ফলে ভালো বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না।
২. শুধুমাত্র একটি প্রবেশ ও বের হওয়ার রাস্তা।
৩. ভবনের স্থানগুলো ছিল খুব সরু।
৪. কোনো বাহ্যিক ফায়ার এস্কেপ বা জরুরি বের হওয়ার পথ ছিল না।
৫. ভবনটি চিমনির মতো কাজ করায় ধোঁয়া ও তাপ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওপরতলায় পৌঁছে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সেন্সর-চালিত মেইন গেট বন্ধ ছিল, যার কারণে মানুষ বের হতে পারেনি। কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে, ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম ও স্প্রিংকলার সিস্টেম কোনোটিই কাজ করছিল না। নিচতলায় বেশ কয়েকটি বড় এলপিজি সিলিন্ডার অরক্ষিতভাবে রাখা ছিল।
২০২১ থেকে ৪৪৫ জনের মৃত্যু
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, জানুয়ারি ২০২১ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত দিল্লিতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৬,৪৬৬ জন মারা গেছেন এবং ১৪,৮৫৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আগুন-সংক্রান্ত ঘটনায় ৪৪৫ জনের মৃত্যু এবং ৩,১৯৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যান্য সব ধরনের দুর্ঘটনায় ৬,০২১ জন মারা গেছেন এবং ১১,৭১৮ জন আহত হয়েছেন।
তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬, ২২শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ১৮ জিলহ্বজ, ১৪৪৭