ভারতনির্ভরতা কমানোর ডাক দিয়ে সেই ভারত থেকেই আমদানি বেড়েছে সর্বোচ্চ
প্রকাশ: রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:২১ পিএম  (ভিজিট : )
ভারতনির্ভরতা কমানোর ডাক দিয়ে সেই ভারত থেকেই আমদানি বেড়েছে সর্বোচ্চ

ভারতনির্ভরতা কমানোর ডাক দিয়ে সেই ভারত থেকেই আমদানি বেড়েছে সর্বোচ্চ

তাজাখবর২৪.কম,অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক: জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনদিন পরই শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এদিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে বাংলাদেশের। সেইসঙ্গে ভারতনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার কথা তোলেন ড. ইউনূসসহ তার সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই। 

এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য উপদেষ্টা জানান, ভারতের পাশাপাশি সরকার টু সরকারের মাধ্যমে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে। সে মাসেই আলু ও পেঁয়াজ আমদানিতে ভারতনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস খোঁজার কথা জানায় ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করা হয় গত বছরের এপ্রিলে। এছাড়া দেশটি থেকে নিউজপ্রিন্ট, গুঁড়া দুধ, সাইকেল ও মোটর পার্টস, সিরামিকওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার, টাইলসসহ আরো অনেক পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় এনবিআর। এমনকি বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাকও তীব্র হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

অথচ, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এসব হাঁকডাক আর পদক্ষেপের কোনও প্রভাবই পড়তে দেখা যায়নি দেশের আমদানি খাতে। বরং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ (গত বছরের ডিসেম্বরে অর্থ বিভাগ থেকে প্রকাশিত) থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পণ্য আমদানির প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ভারত থেকেই গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে এবং সেটা ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রয়েছে ভারত থেকে সরকারি ক্রয়েরও।

ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ভারতের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য যাওয়ার ব্যবস্থা গত বছরের ৯ এপ্রিল প্রত্যাহার করে ভারত। এর কয়েকদিন পরই ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঘোষণা দেয় যে ভারত থেকে সুইং সুতা ও কিছু কাঁচামাল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ করা হবে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায় সিদ্ধান্তটি। সর্বশেষ স্থানীয় শিল্প পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতার সুরক্ষা নিশ্চিতে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে সেফগার্ড ডিউটি আরোপের ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নীতিনির্ধারক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

শিল্পায়ন, রফতানিমুখী উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। অর্থমূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস ভারত। মোট আমদানির ৪৪ শতাংশের বেশি হয় এ দুই দেশ থেকে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় সময়ে সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা, কূটনৈতিক ভাষার কঠোরতা, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত করা এবং পুশ-ইনসহ নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এসেছে।

এরপর ২০২৫ সালে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল, স্থলবন্দরভিত্তিক আমদানি-রফতানি সীমাবদ্ধকরণ, কাঁচা পাট ও সুতা রফতানি-আমদানিতে বিধিনিষেধের মতো ঘটনায় দুই দেশের টানাপড়েন কূটনীতি ও রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।কিন্তু, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি যেখানে হয়েছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ, সেখানে শুধু ভারত থেকে আমদানি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

দেশভিত্তিক আমদানি ব্যয় নিয়ে অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এ বলা হয়েছে, মোট পণ্য আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে সর্বোচ্চ আমদানি করা হয়, যা দেশের মোট আমদানির ৩০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। মোট আমদানিতে ভারতের অংশ ছিল ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

পণ্য আমদানি ব্যয়ের অর্থমূল্য বিবেচনায় সর্ববৃহৎ উৎস চীন হলেও গত অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ভারতের চেয়ে কিছুটা কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয় ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পণ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫২ কোটি ২০ লাখ ডলারের।অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয় ৮৯৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পণ্য। কিন্তু, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের পণ্য। এ হিসেবে, এক বছরের ব্যবধানে ভারত থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

চীন ও ভারতের পর বাংলাদেশের পণ্য আমদানির তৃতীয় বৃহৎ উৎস যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ২৫০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২৮৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের পণ্য। এ হিসেবে অর্থমূল্য বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি কমেছে ১৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গত অর্থবছরে পণ্য আমদানির প্রধান বাজারের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকেও আমদানি কমেছে, ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এছাড়া পণ্য আমদানি কমেছে তাইওয়ান থেকে, ৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।

প্রকৃতপক্ষে, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণ ও ভোক্তা বাজার—বাংলাদেশের সব খাতই কোনো না কোনোভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি নির্ভরতা কমাতে স্থানীয় শিল্পে সক্ষমতা বাড়ানো ও আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য গত পাঁচ দশকে ক্রমেই বড় হয়েছে। দুই দেশের মোট বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশই ভারত থেকে আমদানি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরির্বতন কিংবা এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততায়ও এ পরিস্থিতির বদল ঘটেনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের বাণিজ্য বিশেষ করে ভারত থেকে আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মূলত বাজার অর্থনীতির নিজস্ব গতিপথে।

কূটনৈতিক মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক বহুস্তরীয় এবং জটিল। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমাদের আন্তঃনির্ভরশীলতা আছে অনেক লেয়ারে। সম্পর্ক বহুমাত্রিক। মানে হচ্ছে একটা রাজনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক আছে। একটা কূটনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক আছে। একটা অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক আছে। আরো আছে মানুষে মানুষে সম্পর্ক। এখন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোটাতে টেনশন চলছে, এটা আমরা জানি। রাজনৈতিক বাতাবরণের যে অবস্থা আমরা দেখছি তার ভিন্ন প্রতিফলন দেখছি অর্থনৈতিক জায়গায়। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাতাবরণের টেনশন হলেও অর্থনীতি ও মানুষের জায়গায় কিন্তু এখনো সেই যোগাযোগ আছে। এ কারণেই আমদানিতে আমরা প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি।’

দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন দীর্ঘমেয়াদি হলে পরিণতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, রাজনৈতিকভাবে যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে ভারতের সঙ্গে আমরা সম্পর্ক কমিয়ে ফেলব, তখন ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু আমরা ধরে নিচ্ছি যে এ আদান-প্রদানটা এখনও বাধার মুখে পড়েনি। তবে, রাজনৈতিক সম্পর্ক যদি খারাপ চলতে থাকে, তাহলে একটা না একটা সময় গিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।

 তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২,২৮ রজব, ১৪৪৭ 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝