শিবির নেতা ডা. কফিল নিজেকে ড্যাব নেতা বানাতে মরিয়া!
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৭:৩৪ পিএম  (ভিজিট : )
ডা. কফিল

ডা. কফিল

মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী,তাজাখবর২৪.কম,কক্সবাজার: মেডিকেল কলেজ জীবনে তিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সক্রিয় কর্মী। অনেকের মতে, তিনি জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠনটির ‘সাথী’ ছিলেন। বেশ ক’বার শিবিরের হয়ে নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন। শুধুমাত্র ছাত্র শিবিরের রাজনীতি করার কারণে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস ছাড়তে হয়েছিল। এই রাজনীতির কারণেই তাঁকে স্টাডি ব্রেক দিতে হয়েছে। আর কর্মজীবনে এসে সব সময় ছিলেন জামায়াতে ইসলামি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ‘এনডিএফ’ (ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম) এর রাজনীতির সাথে যুক্ত। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন তিনি সব কিছু পাল্টে ফেললেন! চব্বিশের ৫ আগষ্টের গণআন্দোলনে দেশের পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ‘ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ড্যাব) এর সক্রিয় একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তিনি নিজে ড্যাবের ফরম পূরণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো দিয়েছেনই, এখন সহকর্মী চিকিৎসক ও সদ্য পাস করা ইন্টার্ণ চিকিৎসকদেরও ড্যাবের ফরম পূরণ করতে জোরজবরদস্তি করছেন। আর নিজেকে ড্যাব নেতা পরিচয় দিয়ে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রভাব খাটানোর সবধরণের চেষ্টাই করে চলেছেন।

আর তিনি হলেন ডা. মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের আউটডোর মেডিকেল অফিসার। তিনি কেবল মাত্র জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হলেও হাসপাতালের সহকারি রেজিষ্ট্রার চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বদলির হুমকি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেম্বারে গিয়ে ড্যাবের সদস্য ফরম পূরণ করতে জোরজবরদস্তি এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালের সব কিছুতে নাক গলানোর চেষ্টা করছেন। তিনি মেডিকেল কলেজের কেউ না হয়েও সম্প্রতি সদ্য এমবিবিএস পাস করা ইন্টার্ণ চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ইন্টার্ণ চিকিৎসক পরিষদে’র ভোটার তালিকা জালিয়াতি এবং ইন্টার্ণ চিকিৎসকদের গভীর রাতে ফোন করে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য তদবির ও চাপ প্রয়োগ করেছেন ডা. মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন।কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের একাধিক সুত্রের সাথে কথা বলে এমন সব অভিযোগ মিলেছে।

অভিযোগ মতে, ডা. কফিল উদ্দিন নিজেকে ড্যাব নেতা হিসেবে পরিচিতি করানোর জন্য সব চেষ্টাই করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ড্যাবের সদস্য ফরম পূরণ করে সেই ছবি ফেসবুকে পোষ্ট করেছেন। একই সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসককে ড্যাবের ফরম পূরণ করার জন্য তাদের চেম্বারে গিয়ে চাপ দিয়েছেন। এদের মধ্যে জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগের দুইজন চিকিৎসকও রয়েছেন। যদিও কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কোন কমিটি নেই।সুত্র বলছে, পতিত হাসিনা সরকারের শুরুর দিকে কক্সবাজারে ড্যাবের কমিটি ছিল এবং ড্যাব নেতা-কর্মীরা সে সময় সক্রিয় ছিলেন। সর্বশেষ এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমান পরিচালক ডা. মিজবাহ উদ্দিন ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ থেকে অবসরে যাওয়া বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক ডা. এম এন আলম। সে সময় ডা. মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন ড্যাব নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় সময় পোষ্ট করে বেড়াতেন।

অভিযোগ মিলেছে, ডা. কফিল উদ্দিন জেলা সদর হাসপাতালের সাধারণ একজন আউটডোর মেডিকেল অফিসার হয়েও ড্যাব পরিচয়ে চিকিৎসকদের নানা ভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে বেড়ান। সরকারি চাকুরিবিধি লংঘন করে অফিস চলাকালিন সময়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন। জেলা সদর হাসপাতাল কম্পাউন্ডেই ব্যক্তিগত চেম্বার খুলেছেন।ইন্টার্ণ চিকিৎসক পরিষদের ভোটার তালিকা জালিয়াতি  কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল) ২০২৫-২০২৬ সেশনে ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতার মূলে রয়েছেন ডা. কফিল উদ্দিন। হাসপাতাল সুপার ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ভোটের একদিন আগে হাসপাতালের কর্মচারিদের দিয়ে ভোটার তালিকায় জালিয়াতি করেছেন তিনি।

সুত্র বলছে, পহেলা অক্টোবর থেকে ইন্টার্নশিপে যোগ দেওয়া ৫১ জন চিকিৎসকের উদ্যোগে পরিষদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের ঘোষণা দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ সময় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনও গঠন করে দেন হাসপাতাল সুপার ডা. মং টিন নিউ। ওই কমিটিতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবু মো. শামসুদ্দিনকে প্রধান এবং জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. অং স্যাইন থোয়াই ও ডা. শান্তনু ঘোষকে সদস্য করা হয়।ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, ডা. কফিল উদ্দিন ভোটার তালিকা প্রকাশের আগেই সেখানে পূর্বের সেশনের ১৫ জন চিকিৎসককে যুক্ত করে একটি তালিকা প্রকাশ করান, যা তিনি হাসপাতালের কর্মচারিদের দিয়ে করিয়েছেন। হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মচারিরা সেটা স্বীকারও করেছেন।ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবি, এই চিকিৎসকদের সাথে চলতি নির্বাচনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই; তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে।

তাদের অভিযোগ, ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম ও ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও ডা. কফিল উদ্দিন প্রভাব বিস্তার করে পুরো প্রক্রিয়াকে ঘোলাটে করেছেন।তাদের মতে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর হাসপাতালের কয়েকজন বিভাগীয় প্রধান ও মেডিকেল অফিসার নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন দিতে সরাসরি ও ফোনে চাপ দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংকট জটিল হলে ডা. কফিল উদ্দিন প্রত্যক্ষ ভোটের পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের প্রস্তাব দেন। নানা বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনও ইন্টার্নদের কাছে লটারির প্রস্তাব তোলে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিতে বাধ্য হন। পরে লটারিতে সভাপতি নির্বাচিত হন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ডা. ইকবাল হোসেন।

যদিও ডাক্তার ইকবাল লটারির ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন এবং এই পদ্ধতি নিয়ে বাজে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়ায় বিবৃতি দেন। যা সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে হাসপাতাল সুপারের কাছে লটারি বাতিলের জন্য স্মারকলিপি দেন। এতে পুরো বিষয়টি ঝুলে যায়।এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রার্থী ছিলেন ডা. রাহাত হোসেন।

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। হাসপাতালের ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করে এই সিন্ডিকেট। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন হাসপাতালের প্রধান সহকারি তুষার কান্তি পাল, ওয়ার্ড মাষ্টার এস্তাফিজ ও কবির। এই সিন্ডিকেটের অপকর্ম জেনে যাওয়ায় হাসপাতালের ওয়ার্ড মাষ্টার নুরুল হুদাকে মাত্র এক বছরের মাথায় কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এখন সেই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন ডা. কফিল উদ্দিন।

যা বলছেন ডা. কফিল
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের আউটডোর মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, কোন চিকিৎসককেই জোর করে ড্যাবের ফরম পূরণ করানো হয়নি। যারা ড্যাব সমর্থন করে কেবল তাদেরই ফরম পূরণ করা হয়েছে।কক্সবাজারে ড্যাবের কোন কমিটি নেই স্বীকার করে তিনি বলেন, এখন ড্যাবের কোন কমিটি নেই। কমিটি হলেই কোন পদে দায়িত্বে আসবো।তিনি ছাত্র জীবনে ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি শিবির করতাম এটা সত্য। শিবিরের জন্য আমাকে অনেকবার হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। তবে দাবি করেন, ২০০১ সাল থেকে ড্যাবের রাজনীতির সাথে যুক্ত তিনি।

তিনি ইন্টার্ণ চিকিৎসকদের নির্বাচন প্রভাবিত করার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। একই সাথে ইন্টার্ণদের ভোটার তালিকা করার সাথেও তিনি যুক্ত নন বলে দাবি করেন।ডা. কফিল উদ্দিন বলেন, ইন্টার্ণ বলতে বোঝায় যারা বর্তমানে কর্মরত আছে। ভোটার লিষ্টও হয়েছে তাই। এখন নতুন ইন্টার্ণরা আসছে, তাদের ৫১ জন, আগের ব্যাচের আছে ৯ জন আর চায়না থেকে পাস করে আসছে ৫ জন। সব মিলিয়ে একটা ভোটার লিষ্ট হয়েছে। সেখানে আমার ম্যানিপুলেট করার সুযোগ নেই।

ড্যাবের কেউ নন ডা. কফিল
ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) কক্সবাজার জেলা শাখার সর্বশেষ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম এন আলম জানিয়েছেন, ডা. কফিল উদ্দিন কখনো ড্যাবের সদস্য ছিলেন না, এখনও নেই। তিনি নিজেই নিজেকে ড্যাবের নেতা দাবি করছেন।তিনি বলেন, কক্সবাজারে আমরা সেই শুরু থেকে ড্যাবের রাজনীতির সাথে যুক্ত। কখনোই ডা. কফিল উদ্দিন ড্যাবের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তিনি মূলত জামায়াতের রাজনীতির সাথে যুক্ত।

তাজাখবর২৪.কম,ঢাকা: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২,১৪ জুমাদাস সানী, ১৪৪৭

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
সম্পাদক: কায়সার হাসান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: এ্যাডভোকেট শাহিদা রহমান রিংকু, সহকারি সম্পাদক: জহির হাসান,নগর সম্পাদক: তাজুল ইসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয়: মডার্ণ ম্যানশন (১৫ তলা) ৫৩ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০৮৮-০২-৫৭১৬০৭২০, মোবাইল: ০১৭৫৫৩৭৬১৭৮,০১৮১৮১২০৯০৮, ই-মেইল: [email protected], [email protected]
🔝